ফুলে ফেঁপে উঠছে ভারতের এভিয়েশন সেক্টর

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের কাছে নতুন একটি বিমানবন্দর তৈরি করছে মোদি সরকার। এই বিমানবন্দর তৈরিতে ৮ হাজার শ্রমিক রাত দিন পরিশ্রম করছে। বিমানবন্দরটির জায়গার জন্য সাতটি গ্রাম অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং ৩ হাজার ১১৩টি পরিবারকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে শুরু হয়েছে এর কাজ। শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৪ সালে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নজিরবিহীন দ্রুততার সঙ্গে বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে।

ভারতের এভিয়েশন সেক্টর তথা উড়োজাহাজ শিল্প বিস্ময়করভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে। দেশটিতে মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে চারটি নতুন বিমানবন্দর ও চারটি নতুন টার্মিনাল খোলা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৯টি নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা করছে ভারত সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে ভারতে ১৫টি দ্বৈত–বিমানবন্দর শহর তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া মুম্বাইয়ে তৃতীয় আরেকটি বিমানবন্দর তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।

২০১২–১৩ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিমানরুটে যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ৮০ লাখ। সেটি ২০১৯–২০ সালে ২০ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ২০২৬ সালের মধ্যে ভারত হবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী দেশ।

ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপা ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটে ৫০ কোটি যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এয়ারবাস নামের একটি মহাকাশ সংস্থা বলছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজ পরিচালনবাজার ২০১৯ সালের চেয়ে ২০৪২ সালে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভারত সরকার স্বপ্ন দেখছে, দুবাইয়ের মতো একটি উড়োজাহাজ চলাচল কেন্দ্র তৈরি করার।

নতুন বিমানবন্দগুলো তৈরি হলে ভারতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। ভারতের এভিয়েশন শিল্প অনেক আগে থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক আস্থার প্রতীক। আধুনিক এভিয়েশন সেক্টরটি ভারতীয় শিল্পপতি জাহাঙ্গীর রতনজি দাদাভাই টাটা (জে আর ডি টাটা নামে পরিচিত) ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে নব্বই দশকে এটি বিকশিত হতে শুরু করে এবং ২০২০ সালের পর এটির সম্প্রসারণ আরও দ্রুত গতিতে হতে থাকে।

২০২৬ সালের মধ্যে ভারত হবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী দেশ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াভারতের এভিয়েশন সেক্টরের এই সম্প্রসারণের পেছনে সরকারের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। মোদি প্রশাসন পুরনো সব বিমানবন্দর বেসরকারিকরণ করেছে এবং নতুন নতুন বিমানবন্দর তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ছোট ছোট শহরগুলোকেও আকাশপথের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ভারতে বোয়িংয়ের প্রধান সলিল গুপ্ত বলেন, উড়োজাহাজে চলাচল করা কোনো বিলাসবহুল যাত্রা নয়, সরকার এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে উড়োজাহাজ ভ্রমণের চাহিদাও বেড়েছে। এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান কর্তকর্তা ক্যাম্পবেল উইলসন বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উড়োজাহাজে ভ্রমণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে।’

এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়াও ভারতের আরেকটি বৃহত্তম এয়ারলাইনের নাম ইন্ডিগো। সংস্থাটি গত জুনে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা আরও ৫০০টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে। মাত্র গত বছর কার্যক্রম শুরু করা আকাসা নামের আরেকটি এয়ারলাইন্স বলেছে, তাদের বহরে বর্তমানে ৫৬টি উড়োজাহাজ রয়েছে, এ বছরের শেষ নাগাদ আরও ১০০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এদিকে ইন্ডিগো ইতিমধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এবং মধ্য এশিয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজ পরিষেবা চালু করেছে। এ ছাড়া পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের ওয়ান-স্টপ উড়োজাহাজ সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া। ইন্ডিগোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার এলবার্স বলেছেন, ‘আমরা যদি এভিয়েশন সেক্টরে জায়ান্ট হতে চাই, তাহলে বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইন্সের সঙ্গে আমাদের পাল্লা দিতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত তাদের সঙ্গে।’

দ্য ইকনোমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন  মারুফ ইসলাম