ভারতের লোকসভা নির্বাচন সামনে। চলছে নানা হিসাব–নিকাশ। রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নির্বাচন নিয়েই মুখর। এর মধ্যেই ২১ মার্চ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে আঙুল উঠেছে যে, তিনি নির্বাচনের আগে বিরোধীদের দমন করতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ নিয়ে চলা জোর আলোচনার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে যে, কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে মোদিবিরোধীরা কি এক হতে পারবে?
কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারের পরপরই বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে একের পর এক নিন্দা আসতে থাকে। সবার আঙুলই ছিল বিজেপি সরকারের দিকে। আরও ভালো করে বললে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে। কেউ কেউ তো এমনকি এক কাঠি এগিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘গণঅভ্যুত্থানের’ হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। সাত ধাপের এই নির্বাচনের আগে দেশটির কেন্দ্র সরকারের রোষাণলে পড়ছেন বিরোধী নেতারা। এরই অংশ হিসেবে আর্থিক অপরাধ তদন্তে গঠিত এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এমন অভিযান চালিয়ে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার ও হেনস্তা করছে বলে অভিমত বিরোধীদের।
ভারতের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল কংগ্রেস বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে নিজেদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। তাদের ভাষ্য—ইডি একতরফাভাবে নানা অভিযান চালাচ্ছে। কর সম্পর্কিত এক অভিযোগে দলটির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে রাখা হয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে নির্বাচনের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে সেভাবে প্রচার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লি পড়েছে এক সাংবিধানিক সংকটে। দিল্লির কোনো মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকাকালে এবারই প্রথম গ্রেপ্তার হলেন। এই ঘটনাকে ‘মোদির নোংরা রাজনীতি’ বলে মন্তব্য করেছেন কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টির (এএপি) মুখপাত্র। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী জেলে থেকেই রাজ্য চালাবেন। পদত্যাগ করবেন না।
কেজরিওয়ালকে ২০২২ সালে গৃহীত একটি কথিত দুর্নীতির কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইডি। একইসঙ্গে তারা জানায়, গ্রেপ্তারের আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে নয়বার তলব করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরে বাধ্য হয়েই তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
আম আদমি পার্টি বর্তমানে দিল্লি ও পাঞ্জাবের ক্ষমতায় আছে। কেজরিওয়ালের আগে দলটির সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী মনীষ সিসোদিয়া, সাবেক মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন ও সঞ্জয় সিংকেও গ্রেপ্তার করা হয়, যারা বর্তমানে কারাগারে আছেন। কিন্তু যেসব অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার সবই দলের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।
এর আগে একইভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্য বিরোধী দলগুলোর নেতারাও। গত মাসে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয় হেমন্ত সরেনকে। হেমন্ত সরেনের ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির মতোই বিরোধী জোন ইন্ডিয়া–এর শরিক। এই জোট আগামী নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে লড়তে চায়।
কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে দিল্লিতে বিক্ষোভ করেছে আম আদমি পার্টির নেতা–কর্মীরা। পাশাপাশি অন্য বিরোধী দলগুলোর নেতৃত্ব পর্যায় থেকেও জোর প্রতিবাদ ও মোদি সরকারের নিন্দা করা হয়েছে। বিরোধীরা মোদি সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করছে গণতন্ত্র সূচকে দেশটির অবনমনকে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের ঠিক আগে আগে কেজরিওয়ালের মতো জনপ্রিয় নেতাকে গ্রেপ্তার বুমেরাং হয় কি না। এই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের জোট আরও পাকা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একটা ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বিরোধীরা এ থেকে রসদ নিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের এমন বক্তব্য সত্য করতে হলে বড় দায়িত্ব নিতে হবে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃত কংগ্রেসকেই। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনগুলোর মতো করে একচেটিয়াভাবে আসন বিন্যাসের চেষ্টার মতো যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ জোটবদ্ধ রাজনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সবাই এ ক্ষেত্রে তাকিয়ে আছে ইন্ডিয়া জোটের দিকে। বিরোধী দলগুলো একটি ন্যূনতম সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে মোদির জন্য আসন্ন নির্বাচন কিছুটা কঠিনই হবে বলে মনে করা হচ্ছে।