মোদিকে চোখ রাঙাচ্ছে ‘বেকারত্ব’!

লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ভারতের রাজনীতির অঙ্গনে উত্তাপ তত বাড়ছে। নরেন্দ্র মোদি আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় আসছেন কিনা—এমন প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আর কোন কোন বিষয় ভোটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তা নিয়েও চলছে উত্তপ্ত আলোচনা।

ভারতের বড় দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেস। দুটি দলই এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে ফেলেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এবারের ইশতেহারে দুটি দলই ‘বেকারত্বকে’ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

বিজেপি–কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। এসব সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বিজেপি তার ইশতেহারে বলেছে, ‘অবকাঠামো, বিমান চলাচল, রেলপথ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, ফার্মাসিউটিক্যালস ইত্যাদি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর মনোযোগ দিয়েছে মোদি সরকার। ভারতের যুবকরা কল্পনাও করেনি যে তাদের সামনে এত সুযোগ আসবে।’

অন্যদিকে কংগ্রেস বলেছে, ‘ক্ষমতায় গেলে ৩০ লাখ সরকারি শূন্যপদে চাকরির ব্যবস্থা করবে কংগ্রেস।’

কেন দুটি দলই বেকারত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার সাজাল, তার সুলুক সন্ধান করা যেতে পারে। বিশেষ করে বিজেপি, যে দলের নেতাকর্মীরা ‘হিন্দুত্ববাদ’কে সব সময়ই নির্বাচনী বৈতরণী পার হাওয়ার একমাত্র হাতিয়ার মনে করে, তারাও যখন ধর্মীয় রাজনীতির বদলে বেকারত্বকে তোয়াজ করে ইশতেহার প্রকাশ করে, তখন তা বিস্ময়কর ঘটনাই বটে।

রূপকথার দৈত্যের প্রাণভোমরা যেমন সাত সমুদ্রের নিচে কোনো এক রূপার কৌটার মধ্যে আবদ্ধ ছিল, তেমনি বিজেপি–কংগ্রেসের ইশতেহারে বেকারত্ব স্থান পাওয়ার প্রাণভোমরা ছিল দেশটির লোকনীতি জরিপের ভেতরে।

লোকনীতি ডট ওআরজি থেকে জানা যায়, লোকনীতি জরিপের কেতাবি নাম ‘সেন্টার ফর স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিস’—সংক্ষেপে ‘সিএসডিএস’। এই জরিপেই উঠে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য।

জরিপ বলছে, ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করছেন আগের চেয়ে বর্তমানে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ মনে করেন বেকারত্ব আগের তুলনায় ভয়ানকভাবে বেড়েছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক এই গবেষণা সংস্থাটি সমাজের নানা শ্রেণি–পেশা ও ধর্ম–বর্ণের মানুষের কাছেই মতামত চেয়েছে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতেই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। সিএসডিএস জানিয়েছে, তাদের জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ৬৭ শতাংশ মুসলিম, ৫৭ শতাংশ দলিত হিন্দু এবং ৫৯ শতাংশ জনজাতির মানুষ মনে করে, বর্তমানে চাকরি পাওয়া কঠিন। এমনকি উচ্চবিত্ত শ্রেণির ৫৭ শতাংশ মানুষও বলেছে, আজকের দিনে চাকরি পাওয়া আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়েছে।

বিজেপি–কংগ্রেস উভয় দলই ইশতেহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াভারতীয় সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বলছে, শুধু লোকনীতি জরিপই নয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও–এর বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ভারতে বেকারত্ব বেড়েছে এবং মোট বেকারের ৮৩ শতাংশেরই বয়স ত্রিশের কোটা পেরোয়নি।

বলে রাখা ভালো, ভারতে এখন মোট জনসংখ্যা ১৪০ কোটির ওপরে। এর ৬৫ শতাংশের বয়সই ৩৫ বছরের নিচে। এই বিপুল সংখ্যক তরুণ–যুবাদের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়েই ২০১৯ সালে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু পাঁচ বছর পর তরুণ–যুবাদের সেই স্বপ্ন যেন অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

এসব তথ্য নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। কারণ ২০১৯ সালের লোকনীতি জরিপের ফলাফল বলছে, তখন মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ ভোট দেওয়ার সময় বেকারত্বকে বিবেচনায় নিতেন। আর এখন সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে।

নির্বাচনের আগে এসব প্রাক–নির্বাচনী জরিপ ভোটের মাঠে বেশ প্রভাব রাখে। এবারের জরিপ বলছে, শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষ বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে বেশি আমলে নিচ্ছে। গ্রামের গরিব ও অল্পশিক্ষিত মানুষেরা দ্রব্যমূল্যকে এবং শিক্ষিত তরুণেরা বেকারত্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জরিপকারীদের কাছে।

এতদিন মনে করা হতো, হিন্দুত্ববাদ ও রামমন্দিরের মতো ধর্মীয় ইস্যুগুলোকে তুরুপের তাস বানিয়ে নির্বাচন উৎরে যাবেন মোদি। কিন্তু লোকনীতি জরিপ দিচ্ছে ভিন্ন ইঙ্গিত। এবারের জরিপে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ রাম মন্দিরের মতো সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে কথা বলেছে। অর্থাৎ বিজেপির ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ স্লোগান এবার খুব একটা ম্যাজিক দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না।

তবে জরিপের বাইরেও কিছু বাস্তবতা রয়েছে। যেমন, কর্ণাটকের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলেও শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে থাকা ঝাঁ চকচকে বেঙ্গালুরুর মানুষেরা কিন্তু মোদির ওপরেই আস্থা রেখেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ থেকে বোঝা যায়, হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িকতা যতটা মধ্যবিত্ত ও তথাকথিত শহরে ‘আধুনিক’ মানুষদের মধ্যে জারি আছে, মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে ততটা নেই। প্রান্তজনদের কাছে এখনো জীবন ও জীবিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভোটের আগে তারা বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকেই প্রধান বিষয় হিসেবে দেখছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, যে দল এ দুটি বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারবে, তাদেরই ভোট দেবে সাধারণ খেটে খাওয়া ভারতীয় ও তরুণ–যুবকেরা। তাই এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বেকারত্বকে বিশেষভাবে আমলে নিয়েছে বিজেপি ও কংগ্রেস, দুই দলই।

শেষ পর্যন্ত কাদের ওপর আস্থা রাখে ভারতের ভোটাররা, সেটিই এখন দেখার।