আগামী ৪ বছর আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান এই নেতার নির্বাচনী প্রচারে একটি বড় অংশ জুড়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলা যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি এসব যুদ্ধ থামাতে পারবেন।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার এক বছর পরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যা এখনও চলমান। জো বাইডেনের প্রশাসনের যাত্রা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে এ পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা করে। এরপর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এতে ৪৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আর সম্প্রতি লেবাননেও ইরানপন্থী সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লার বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। এখানেও তেল আবিবকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।
যুক্তরাজ্যের চ্যাথাম হাউস থিঙ্কট্যাঙ্কের পরিচালক ব্রনওয়েন ম্যাডডক্স বলেন, এটি বিপাবলিকানদের অসাধারণ রাজনৈতিক বিজয়। এটি খুব স্পষ্ট যে, ট্রাম্পকে জয়ের পথে এগিয়ে নিতে অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো ফ্যাক্টরগুলোই প্রভাব ফেলেছে। গতবার যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হন তখন তিনি ছিলেন রাজনৈতিক নবজাতক আর এখন বেশ অভিজ্ঞ হয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি কীভাবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামাবেন। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, এই দুই দেশের নেতারই ভুল রয়েছে এবং তাদের উভয়েরই শক্তি রয়েছে। তবে আমি আসলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত মার্কিন সহায়তার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অনুরোধের সমালোচনাও করেন তিনি। গত জুনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে আমি বিষয়টি নিষ্পত্তি করে ফেলব।
লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের মার্কিন কর্মসূচির পরিচালক লেসলি ভিনজামুরি বলেন, আমাদের ট্রাম্পের ফেস ভ্যালুকে মূল্যায়ন করতে হবে। ট্রাম্প ধরে নিয়েছেন যে তিনি খুব দ্রুত একটি চুক্তি করতে পারেন। তিনি সম্ভবত ইউক্রেনকে আর কোনও সহায়তা বন্ধ করে দেবেন। ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন যা জেলেনস্কিকে অনেক কিছু স্বীকার করে নিতে বাধ্য করতে পারে।
ক্ষমতায় থাকার সময় ট্রাম্প মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করেছিলেন যা ফিলিস্তিনি এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ব্যাপকভাবে নিন্দা করা হয়েছিল। তিনি সিরিয়ার দখলকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের দাবিকেও স্বীকৃতি দেন।
তাঁর প্রশাসন তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির মধ্যস্থতা করেছিল, যা ইসরায়েল এবং মুষ্টিমেয় আরব দেশগুলির মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করার জন্য তৈরি হয়েছিল। ।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট ও সিইও ন্যান্সি ওকেল বলেন, ট্রাম্প মূলত বিশ্বাস করেন, সমস্যার দিকে অর্থ নিক্ষেপ করা হলো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সমাধানের উপায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাইডেন মানবিক দিক বিবেচনা করে সীমিত উপায়ে যে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন তার বিপরীতে তা হয়তো ট্রাম্পের দিক থেকে দেখা যাবে না। এ ছাড়া ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুকে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে পারেন। তবে ট্রাম্প একটি নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারেন যদি ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করে।
ট্রাম্প ২০১৬ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসেন। এরপর আরোপ করেন কঠোর সব নিষেধাজ্ঞা। এরপর থেকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম শুরু করে।
চ্যাথাম হাউস থিঙ্কট্যাঙ্কের পরিচালক ব্রনওয়েন ম্যাডডক্স বলেন, ট্রাম্প বরাবরই ইসরায়েলের বড় সমর্থক। হোয়াইট হাউসে কমলার বদলে ট্রাম্পকে পেয়ে নেতানিয়াহু খুশিই হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে ট্রাম্প তার এবারের শাসনামলে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলেছেন। হতে পারে তিনি কোনো ভালো পদক্ষেপ নিতে পারেন।
এদিকে চীনা নীতিতে এবারও আগের অবস্থানেই আছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে ঢুকতে পারলেই চীনা পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথে ট্যারিফের দেয়াল তোলার আগাম ঘোষণা এরই মধ্যে দিয়ে রেখেছেন তিনি । তবে তার বদলে কমলা হ্যারিস জিতলেও তা দেশটির জন্য বেশি স্বস্তিকর হতো না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে চীন থেকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা আরও বেগবান হতে পারে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কেবল যুক্তরাষ্ট্রই নয় চীনা বাণিজ্যে পশ্চিমাদের নীতি পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারেন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর বিভক্তি এর অন্যতম কারণ বলছেন তারা।
তাইওয়ান নিয়েও ট্রাম্পের বার্তা স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর আমলে চীন কখনই গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ান আক্রমণ করার সাহস করবে না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট