মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। শুক্রবার থেকেই খুলছে হরমুজ প্রণালি। আর এতেই ওলটপালট হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। বড় ধাক্কা লেগেছে তেল আবিবে। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই চুক্তি হতে চলেছে এক রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন। কীভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে টানল ইরান? আর কেন এই চুক্তিকে বলা হচ্ছে নেতানিয়াহুর জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান? আজ আমরা সে আলোচনাই করব।
ট্রাম্পের ইউ-টার্ন
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরান–আমেরিকা শান্তিচুক্তির মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে আগামী শুক্রবার জেনেভায় হতে যাওয়া আনুষ্ঠানিকতার ওপর। ইসরায়েলের কট্টর লবিস্টদের সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে হোয়াইট হাউস এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ একসময় নেতানিয়াহুই নিজেকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে দাবি করতেন। মার্কিন কংগ্রেস থেকে শুরু করে পেন্টাগন—সবখানেই ছিল তাঁর কড়া প্রভাব।
কিন্তু এবার ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ইরানের সঙ্গে এক টেবিলে বসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওবামা প্রশাসনের আমলে নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করতে পারতেন, ট্রাম্পের জমানায় সেই সুযোগ আর নেই। ট্রাম্প পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের কাছে ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী নীতি আর চলবে না।
নেতানিয়াহুর তিন স্তম্ভে ফাটল
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকে আছে মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর। এক, নিজেকে ইসরায়েলের একমাত্র রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা; দুই, ওয়াশিংটনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখা; এবং তিন, ইরানকে চিরতরে দুর্বল করা। ট্রাম্পের এই একটি চুক্তি নেতানিয়াহুর সেই তিনটি স্তম্ভকেই এক ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি বৈরুতে ইসরায়েলের অতর্কিত হামলার পর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি। আমেরিকার এই প্রকাশ্য চড় লুফে নিয়েছে নেতানিয়াহুর প্রতিপক্ষরা। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সরাসরি আক্রমণ করেছেন নেতানিয়াহুকে। তিনি বলেছেন, ‘নেতানিয়াহুর সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা—হয় আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত, অথবা আমেরিকার পা ধরে ইসরায়েলি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া।’ অর্থাৎ সামনেই ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন, আর তার মাত্র কয়েক মাস আগে নেতানিয়াহুর পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।
কট্টরপন্থীদের চাপ
নেতানিয়াহুর ওপর চাপ শুধু বাইরে থেকে নয়, আসছে তাঁর নিজের জোট সরকারের ভেতর থেকেও। তেহরানের মূল দাবি ছিল, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। আর ওয়াশিংটন সেই দাবিতেও রাজি হয়েছে। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফ জানিয়েছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি ইসরায়েলের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। ইসরায়েল এই চুক্তির অংশও নয়।’ কিন্তু ইসরায়েল কি চাইলেই এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলছেন, ‘আমেরিকানরা কেন এটি মেনে নিল, তা বোঝা কঠিন। লেবাননে কী ঘটবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে হিজবুল্লাহকে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার এবং লেবাননের রাজনীতিতে গোষ্ঠীটিকে প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ যে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতে ইসরায়েল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করল, এতে কোনো লাভ হলো না, বরং তারা আরও শক্তিশালী হলো।
যুদ্ধক্লান্ত ইসরায়েল
গাজায় হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর রণকৌশল ছিল আক্রমণাত্মক হওয়া। এই কৌশলে ইসরায়েলি বাহিনী গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, হত্যা করেছে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষকে। কিন্তু ফলাফল কী? হামাস এখনো গাজার অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেদের শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলছেন, ইসরায়েলের এই নতুন নিরাপত্তা কৌশল আসলে তাদের নিজেদের জন্যই ফাঁদ। ইসরায়েলি বাহিনী এখন একই সঙ্গে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকায় আটকে গেছে। দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধ ইসরায়েলের সামরিক সম্পদ এবং তাদের রিজার্ভ বাহিনীকে চরম ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অথচ তাদের প্রধান শত্রু ইরান এখন আমেরিকার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সবসময় দাবি করতেন, তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতাই আঞ্চলিক হুমকি থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার সেরা উপায়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার। কিন্তু ইতিহাস আজ উল্টো রথে হাঁটল। ইরানের শাসনব্যবস্থা তো বদলায়ইনি, উল্টো নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতি তাকে আজ নিজের পরম মিত্র আমেরিকার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন হয় তাকে আমেরিকার সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে, না হলে চিরতরে রাজনৈতিক নির্বাসনে যেতে হবে।


লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের আচরণ ভালো লাগেনি: ট্রাম্প
ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য পূরণ হলো না যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের 
