ফিরে দেখা ২০২৪

সৌদি আরবের নয়া কূটনৈতিক তৎপরতা

এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের হিসেব-নিকেশ বদলে দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থকে সরিয়ে নিয়েছে বিশ্বের মনোযোগ। সবার নজর এখন মধ্যপ্রচ্যে। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অমীমাংসিত সমস্যা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। এতে নতুন অধ্যায় হিসেবে যোগ হয়েছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন ও বিদ্রোহীদের ক্ষমতা গ্রহণ।

মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে যেসব দেশের নিবিড় সংশ্লিষ্টতা আছে, সৌদি আরব ও ইসরায়েল তাদের অন্যতম। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদির পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে বদলে গেল, তা আকর্ষণীয় বটে।

ফিলিস্তিন নিয়ে নতুন প্রতিশ্রুতি
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির গত মে মাসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি-ইসরায়েলের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ অনুযায়ী এ সমঝোতা হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা সব ওলট-পালট করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি-ইসরায়েল সমঝোতার মূল কথা ছিল এ রকম, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে। চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আক্রান্ত হলে সামরিকভাবে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি রিয়াদকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করতে সহায়তা দেবে ওয়াশিংটন। বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে সৌদি আরব। 

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সৌদি আরব সব সময় সরব ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিবিসি রয়টার্সের মতো প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের মূল শর্ত পূরণ হলে ফিলিস্তিনের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি ছিল রিয়াদ। আর এমন নীতি জানতে পারে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। তাই অনেকটা মরণ কামড়ের মতো ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। 

৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা সব ওলট-পালট করে দেয়। ছবি: রয়টার্সগাজা যুদ্ধ শুরুর পরপরই সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রকল্প ‘হিমাগারে’ চলে যায়। তবে গত এক বছরে বাইডেন প্রশাসন তা চালু রাখার জন্য নানা পর্যায়ে কাজ করে গেছে। সৌদি প্রশাসনও প্রকল্পটি একেবারে বাতিল করেনি। 

এখন গাজা বিষয়ে সৌদির অবস্থান হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অন্যতম পূর্বশর্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরির জন্য গত সেপ্টেম্বর থেকে একটি উদ্যোগ শুরু করেছে রিয়াদ। গত ৩০ অক্টোবর রিয়াদে এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ৯০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। 

সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হলে রিয়াদ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না।

গালফ রিসার্চ সেন্টারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রিয়াদের বর্তমান দৃঢ় অবস্থানের মূলে আছে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের বাসনা। কারণ, ফিলিস্তিন নিয়ে সারা বিশ্ব তো বটেই, এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের আবেগ সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি এ আবেগ নিজেদের পক্ষে রাখতে চায়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারলে মানুষ তা দীর্ঘদিন স্মরণে রাখবে। স্বাভাবিকভাবে আঞ্চলিক নেতৃত্বে দেশটির কদর বাড়বে। 

ইরান ইস্যুতে অবস্থান বদল
সৌদি আরব আদর্শিক ও সামরিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এক সময় সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করত ইরানকে। তাই দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কও ছিল সাপে-নেউলে। কিন্তু সেই অবস্থা বদলাতে শুরু করেছে। চীনের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৩ সালের মার্চে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন সেই বদলের সূচনাবিন্দু। এখন দেশ দুটি অর্থনীতিসহ অন্যান্য খাতেও সহযোগিতা করছে।

সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্সভিশন-৩০
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর মতো সৌদি আরবের অর্থনীতিও মূলত জ্বালানি তেলনির্ভর। কিন্তু দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে, বহুমুখি করছে অর্থনীতি। এ জন্য নানা বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা ভিশন-৩০ নামে পরিচিত। 

দ্য নিউ আরবের প্রতিবেদনে জানা যায়, ভিশন ৩০-এর আওতায় ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে সৌদি। এরই অংশ হিসেবে দেশটি তার অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্ক ঢেলে সাজাচ্ছে। অথচ এসব কিছুর জন্য এক সময় মোটাদাগে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকত। কিন্তু ব্রিকসভুক্ত দেশ তথা রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত। এসব দেশের সঙ্গে রিয়াদের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও নেতাদের বৈঠক বেড়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে সৌদি আরব, যা অর্থনীতির পাশাপাশি নিরাপত্তারও বিশেষ জায়গা।

মধ্যস্থতাকারী হওয়ার প্রচেষ্টা
রাশিয়া-ইউক্রনে যুদ্ধে সৌদি আরব নিজেদের নিরপেক্ষ রাখতে সফল হয়েছে। শত চেষ্টা করেও বাইডেন প্রশাসন যুবরাজ সালমানকে স্পষ্টত রাশিয়াবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করাতে পারেননি। অন্যদিকে সরাসরি ইউক্রেনবিরোধীও কোনো নীতি বা পদক্ষেপ নেয়নি রিয়াদ। বরং ইউরোপের এমন সংকটে রিয়াদ ভারসাম্যপূর্ণ পথে হেঁটেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের মার্চে ইউক্রেন ও রাশিয়া সফর করেছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফায়সাল বিন ফারহান। এ সময়ে তিনি উভয় দেশের মধ্য যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব করেন। রিয়াদ উভয় দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধবন্দী বিনিময় চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছে। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান গত জুন মাসে জেদ্দায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিলের সাতকাহন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল সৌদি আরব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ সম্পর্ক ছিল একরকমের বিনিময়ের। সৌদি আরব তেল দিত, বিনিময়ে  নিরাপত্তা, অস্ত্র, গোলা-বারুদ দিত যুক্তরাষ্ট্র। 

তবে এক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট খাতে বিনিময়ের এ সম্পর্ক অন্যদিকে ডালপালা মেলতে শুরু করে। গত শতকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় পেট্রোডলার ওয়াহাবি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে মিশে সোভিয়েত রাশিয়া ও আরব জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে শক্তিশালীভাবে সমর্থন করে সৌদি।

অন্যদিকে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে সৌদি আরব সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে হাজির হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা (দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ) চালানোর আগ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজার ও ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রিয়াদকে প্রয়োজন মনে করত ওয়াশিংটন। কিন্তু এ যুদ্ধ শুরু করে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা বড় ধাক্কা খায়। আফগানিস্তানেও তাদের একই পরিণতি হয়। এসব কিছু ওয়াশিংটনের কৌশলীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

টুইন টাওয়ার হামলার পর প্রায় ১০ বছর টানা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণকারী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর শাসনামলে এশিয়াকে মনোযোগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে ওয়াশিংটন। চীনসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তারা সম্পর্ক নবায়ন করতে শুরু করে। ফলে সৌদি আরবসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব ওয়াশিংটনের কাছে কমতে থাকে।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্যমতে, ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে মিত্র দেশ মিশরের হুসনি মুবারককে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি যুক্তরাষ্ট্র। উল্টো ৩০ দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা এ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহায়তা দেয় ওয়াশিংটন। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যের একনায়কদের বিচলিত করে। তখন ওই অঞ্চলের ওয়াশিংটনের মিত্ররা নিজেদের কূটনীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন ভাবনাসহ সব কিছু ঢেলে সাজাতে শুরু করে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কূটনীতিতেও পরিবর্তন আনে সৌদি আরব। সৌদি আরবের এই পররাষ্ট্রনীতি প্রায় সব সামর্থ্যবান দেশ অনুসরণের চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে ভারতের কথা বলা যায়। রাশিয়া ও চীন এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক বা সোভিয়েত আমলের ওয়াশিংটন ও মস্কোকেন্দ্রিক দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত।

তথ্যসূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, গার্ডিয়ান, দ্য নিউ আরব, আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি, গালফ রিসার্চ সেন্টার