৭টি যুদ্ধ শেষ করার দাবি ট্রাম্পের, আসলে কয়টি পেরেছেন?

রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনার সময় নিজেকে ‘পিসমেকার-ইন-চিফ’ বা তথাকথিত ‘প্রধান শান্তিদূত’ হিসেবে উপস্থাপন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই আলোচনা চলাকালে দুটি বড় কৃতিত্বের দাবি করেন তিনি। একটি হলো, তিনি যুদ্ধবিরতি নয়, বরং স্থায়ী শান্তিচুক্তি চান। আরেকটি হলো, দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিমধ্যে ছয়টি যুদ্ধ থামিয়েছেন তিনি।  

গত ১৮ আগস্ট ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি ছয়টি যুদ্ধ শেষ করেছি। কোনো ক্ষেত্রেই যুদ্ধবিরতি শব্দ ব্যবহার করতে হয়নি।’ পরের দিনই আবার সংখ্যা বাড়িয়ে ‘সাতটি’ বলেন তিনি।

ট্রাম্পের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। আদতে ট্রাম্প কয়টি যুদ্ধের অবসান করতে পেরেছেন, তা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।  

ইসরায়েল–ইরান
গত ১৩ জুন ইরানে ইসরায়েলের হামলা দিয়ে শুরু হয় ১২ দিনের সংঘাত। পরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রও, যা আন্তর্জাতিকভাবে সংঘাত দ্রুত থামানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

২৩ জুন ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান যুদ্ধবিরতি শুরু করবে, ১২ ঘণ্টা পর ইসরায়েলও যোগ দেবে, এরপর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধের অবসানকে বিশ্ব স্বাগত জানাবে।’

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি একে ‘বিজয়’ বললেও যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে ইসরায়েল জানায়, প্রয়োজনে আবারও আক্রমণ করা হতে পারে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মাইকেল ও’হ্যানলনের ভাষায়, ‘এটি আসলে যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং বাস্তবতাভিত্তিক এক যুদ্ধবিরতি।’

ভারত–পাকিস্তান
গত এপ্রিলের শেষে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এর জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এমনকি যুদ্ধবিমানও ব্যবহৃত হয়। এর চার দিন পর ট্রাম্প দাবি করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ আলোচনার পর ভারত–পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’

পাকিস্তান ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রশংসা করে। এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও নাম প্রস্তাব করে। তবে ভারত জানায়, যুদ্ধবিরতির আলোচনা হয়েছে দুই দেশের সামরিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে বড় করে দেখার কিছু নেই।

রুয়ান্ডা–ডি আর কঙ্গো
রুয়ান্ডা ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত এ বছর ফের তীব্র হয়। গেল জুনে দুই দেশ ওয়াশিংটনে শান্তি চুক্তি করে। কিন্তু এরপরও উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ‘ডি আর কঙ্গো ও রুয়ান্ডার লড়াই বন্ধ হয়নি। ফলে যুদ্ধবিরতিও কার্যকর হয়নি।’

থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া
গেল জুলাইয়ের শেষ দিকে সীমান্ত সংঘাত দেখা দেয় থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়ায়। এ সময় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, যুদ্ধ না থামালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বসবে না। এর কয়েক দিনের মধ্যেই দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়।

আর্মেনিয়া–আজারবাইজান
চলতি আগস্টের ৮ তারিখে হোয়াইট হাউসে আর্মেনিয়া–আজারবাইজান শান্তিচুক্তি ঘোষণা হয়। দুই দেশের নেতা ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার কথা বলেন।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ও’হ্যানলনের মতে, ওভাল অফিসে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানই হয়তো শান্তির পথে এগোতে ভূমিকা রেখেছে। তবে এই অঞ্চলে লড়াইয়ের ইতিহাস দীর্ঘ।

মিশর–ইথিওপিয়া
মিশর–ইথিওপিয়ার মধ্যে নীল নদের বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও সরাসরি কোনো যুদ্ধ হয়নি। ট্রাম্প বলেন, ‘যদি আমি মিশরে থাকতাম, নীলের পানি আমি চাইতাম। খুব শিগগিরই আমি এই সমস্যার সমাধান করব।’ তাঁর মন্তব্যকে মিশর স্বাগত জানালেও ইথিওপিয়া বলেছে, এতে উত্তেজনা বাড়বে।

সার্বিয়া–কসোভো
গত জুনে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘সার্বিয়া ও কসোভো বড় যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল, আমি বললাম করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য হবে না।’ তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তখন যুদ্ধই চলছিল না। আগেও দুই দেশ অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে, কিন্তু সেটি যুদ্ধবিরতির অংশ ছিল না।

ফলে সাতটি যুদ্ধ শেষ করার যে দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন, তাঁর অনেকগুলো আসলে স্বল্পস্থায়ী সংঘাত কিংবা স্থায়ী কোনো শান্তিতে রূপ নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই ছিল শুধু যুদ্ধবিরতি, যা ট্রাম্প নিজেই বিভিন্ন সময় বলেছেন।