নেপালে বিক্ষোভের মূল কারণ কি ‘গণতন্ত্র’, নাকি অন্য কিছু?

নেপালে ‘জেন জিদের’ বিক্ষোভের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হয়েছে, আহত শতাধিক। কাঠমান্ডুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভের মূল কারণ সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং দেশজুড়ে দুর্নীতি। কেউ কেউ বলছেন, সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ, তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথাও বলছেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে রাজতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হওয়া নেপালে এখন আসলে আন্দোলন হচ্ছে কী কারণে?  

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমুন্ডু পোস্ট বলছে, গত শুক্রবার নেপাল সরকার ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়। সরকারের দাবি, এই প্ল্যাটফর্মগুলো নেপালের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নেপালের তরুণ প্রজন্ম। বিক্ষোভকারীদের মতে, সরকার ভিন্নমত দমন এবং সমালোচনামূলক বক্তব্য বন্ধ করার জন্যই এটি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নেপালের তরুণদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই বিক্ষোভ উসকে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ‘দুর্নীতি বন্ধ করো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়’ এবং ‘তরুণরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে’–এর মতো স্লোগান দিতে থাকে। টিকটকের মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণরা সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সঙ্গে সাধারণ নেপালিদের দৈনন্দিন জীবনের দুর্দশার তুলনা করে ভাইরাল কন্টেন্ট তৈরি করে আন্দোলনকে আরও জোরদার করে।
     
প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি তাঁর সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, সরকার দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে এমন কোনো কাজ মেনে নেবে না। সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে, তবে অনলাইন অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল বলছে, নেপালে চলমান এই গণবিক্ষোভ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গভীর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ঘটে যাওয়া আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় নেপালের তরুণরা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। এই বিক্ষোভের ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাঠমান্ডুর রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা। ছবি: রয়টার্সভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, সামাজিক মাধ্যম বন্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলেও তরুণ নেপালিদের মধ্যে আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ। সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করে সেই অসন্তোষ উসকে দিয়েছে সরকার। বিক্ষোভকারীদের দাবি, সরকারের দুর্নীতি নিয়ে আওয়াজ তোলা বন্ধ করার জন্য এসব সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার চাইছে না এসব নিয়ে আলোচনা হোক। 

কেউ কেউ বলছেন, এই আন্দোলন আসলে সরকারের ‘স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের’ বিরুদ্ধে। তারা আসলে পরিবর্তন চান। এই প্রজন্ম নতুন কিছু চাইছে। এর মধ্যে কয়েকজন আন্দোলনকারী বলছেন, তারা আসলে ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা’ চাইছে। তবে গণতন্ত্রের কথা এবং স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের দিকে ইঙ্গিত করলেও এতদিন নেপালিদের মধ্যে মিশ্র মনোভাব পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। গত মার্চেই দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। 

গত মার্চে রাজতন্ত্রে ফিরে যেতে রাস্তায় নেমে পড়েন নেপালিরা। ক্ষমতাচ্যুত রাজাকে ফের ক্ষমতায় দেখতে চেয়ে তাঁরা আওয়াজ তোলেন। যদিও এই রাজাকে তাঁরাই ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, গত মার্চে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে দেশটির সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ পশ্চিমাঞ্চল থেকে ট্রিপ দিয়ে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলে হাজারো জনতা তাঁকে স্বাগত জানায়। রাস্তা ভরে যায় জনতায়।

দেশের চলমান অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ জানানোর পাশাপাশি বিলুপ্ত রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের এই অনুসারীরা। এ জন্য তাঁকে স্বাগত জানাতে ১০ হাজারের বেশি সমর্থক ত্রিভুবন বিমানবন্দরের প্রধান প্রবেশপথের কাছে জড়ো হয়েছিলেন। জড়ো হওয়া মানুষেরা স্লোগান দিতে থাকে, ‘রাজার জন্য রাজপ্রাসাদ খালি করুন। রাজা ফিরে আসুন, দেশকে বাঁচান। আমাদের প্রিয় রাজা দীর্ঘজীবী হোন। আমরা রাজতন্ত্র চাই।’ এমনকি তারা ধর্মনিরপেক্ষতা থেকেও বেরিয়ে আসার তাগিদ দেয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বলছে, ২০০৮ সালে নেপালের ২৪০ বছরের পুরোনো হিন্দু রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করার বিষয়ে পার্লামেন্টে ভোট হয়। ভোটাভুটিতে রাজতন্ত্র বিলোপের পক্ষে রায় এলে রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ পদত্যাগ করেন। এরপর নেপালে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

তখন থেকে এখন পর্যন্ত নেপাল ১৩টি সরকার পেয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দেশটির অনেকে প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থার প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রজাতন্ত্রের সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ। অর্থনীতির নাজুক অবস্থা এবং ব্যাপক দুর্নীতির জন্যও প্রজাতন্ত্রকে দায়ী করেছেন তাঁরা।