সোনা ও সোনার তৈরি অলঙ্কারের প্রতি মানুষের আগ্রহ সেই প্রাচীনকাল থেকে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন সময় সোনাকে দেখা হয়েছে শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে। সেই সঙ্গে এটি অর্থবিত্তের প্রতীকও। সবাই চায়, সামান্য পরিমাণ হলেও সোনা নিজের সংগ্রহে রাখতে।
কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সোনা হচ্ছে এমন এক সম্পদ– যা বিপদে কাজে লাগে। ফলে দাম যাই থাকুক, এর চাহিদা সাধারণত কমে না। অর্থবাজার ধসে পড়লে হঠাৎ করে সোনা কেনার হিড়িক পড়ে যায়। বিপুলসংখ্যক ক্রেতা সোনা কিনে রাখার চেষ্টা করেন। সব মূল্যবান ধাতুর মধ্যে সোনার চাহিদা সব সময়ই শীর্ষে। দাম বাড়ুক বা কমুক, ক্রেতারা ঠিকই হাজির হন সোনার দোকানে।
দিন দিন বাজারে সোনার দাম হয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী। তবুও সোনা কেনায় ভাটা পড়েনি এতটুকু। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধাতুটির দাম কেন এত বেশি এবং কেন এত আবেদন?
সোনার দামের সর্বোচ্চ রেকর্ড
চলতি অক্টোবরের শুরুতে বিশ্বে প্রথমবারের মতো সোনার দাম রেকর্ড চার হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। মাসের মাঝামাঝি ১৭ অক্টোবর তা নতুন রেকর্ড গড়ে ৪ হাজার ২০০ ডলারে (৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা) পৌঁছায়। বাংলাদেশেও বর্তমানে এক ভরি সোনার দাম ২ লাখের বেশি। সম্প্রতি সোনার ভরি ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকায় পৌঁছায়। এটি দেশের ইতিহাসে সোনার দামের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
সংকট ও অস্থিরতার সময়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দাম বাড়ে। কিন্তু এবার দামের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, বিশ্ব তা আর কখনোই দেখেনি। বিশ্বব্যাপী সোনার দাম আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক বিধ্বংসী সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে একধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ডলারের ওপর আর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছেন না।
কেন দাম বাড়ছে সোনার?
সোনার দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো, বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনা কেনা বাড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও চীনের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমতে পারে, এমন আভাস মেলায় সোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের।
বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট ও বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কিছু স্থিতিশীল বিনিয়োগ খুঁজছে, আর সেটাই হলো সোনা। আগে যেমন আমেরিকার বন্ড মার্কেটকে নিরাপদ মনে করা হতো, এখন আর তা নেই। বিশেষ করে চীন, ভারত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো সোনার ওপরই বেশি ভরসা করছে।
বিনিয়োগকারীরা বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির সময় সোনাকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করেন। তাই করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব রেখেছে।
সোনা কেনায় এগিয়ে চীন
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাণিজ্যযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচুর পরিমাণে সোনা কিনেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও গাজায় সংঘাতের পাশাপাশি চীনের এমন পদক্ষেপের কারণে বিশ্বব্যাপী সোনার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার (পিবিসি) এই পদক্ষেপে উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও প্রভাবিত হয়েছে। অনেক দেশই স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, সোনা কেনায় চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং গত দুই বছর ধরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভ অন্যান্য সম্পদ থেকে সোনার ভাণ্ডারে স্থানান্তর করছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ হাজার ২৯৮ টন (২২ লাখ ৯৮ হাজার কিলোগ্রাম) সোনার রিজার্ভ রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে চীনের ২ হাজার ২৭৯ টন সোনার রিজার্ভ ছিল।
চীনের অভ্যন্তরীণ সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জে রেকর্ড পরিমাণ বেচাকেনার তথ্য পাওয়া যায়। পিবিসির পাশাপাশি চীনের সাধারণ নাগরিকরাও স্বর্ণের মুদ্রা, বার ও গয়না কিনছেন। অনেক সাধারণ মানুষও সোনা কিনে রাখছেন। বিয়েতে বা বিশেষ দিনে উপহার হিসেবে পরিবারের সদস্যদের সোনার বার দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে চীনাদের।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কারণে সোনা কিনছে
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য চীন মার্কিন ডলারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশ্বের সংরক্ষিত মুদ্রা হিসেবে বেশিরভাগ পণ্যের দাম ডলারে হয় ও বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বাণিজ্য মার্কিন ডলার ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য গত ৩০ বছরে চীন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করেছে, যার বেশিরভাগই ডলার।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনার এই ধারা আরও কয়েক বছর ধরে চলমান থাকবে। এ প্রক্রিয়াটিকে ডলারের বিকল্প তৈরির একটি উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোনার সঙ্গে ভারতীয়দের ঐতিহ্যগত বিশেষ সম্পর্ক আছে। এ কারণেই দেশটিতে স্বর্ণের বাজার প্রসারিত হয়েছে। চীনের পর হলুদ ধাতুর জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত।
ভারতে বিয়েতে নববধূদের সোনার গয়না দেওয়ার রীতি অতি প্রাচীন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসবে সোনা কেনাকে সে দেশে শুভ বলে মনে করা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব দিওয়ালির আগে ধনতেরস উপলক্ষে এক টুকরো সোনা কিনলেই লক্ষ্মী লাভ করা যায়– এমন বিশ্বাসের কারণে এই ধাতুর চাহিদা আরও বেড়ে যায়। চাহিদার বাড়বাড়ন্তে ভারতের বাজারে বেড়ে যায় সোনার দাম। মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও সোনার দোকানে ভিড় কমে না।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘দুর্দিনের সহায়’ হিসেবেও দেশটিতে সোনার বেশ কদর রয়েছে। দিন দিন এই কদর বাড়ছে। করোনাকালে অনেক পরিবার অপ্রাতিষ্ঠানিক বাজারে সোনার অলংকার, বার ও কয়েন বিক্রি করে সংকটকালীন চাহিদা মিটিয়েছে। আবার অনেকে বিপদ সামাল দিতে সোনা গচ্ছিত রেখে ঋণ নিয়েছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট শুরুর পর ভারতের বাজারে সোনার দাম সর্বোচ্চ হয়েছিল। ভারতের পাশাপাশি অনেকে দেশই রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটময় পরিস্থিতিতে সোনায় বিনিয়োগে জোর দেয়। সুরক্ষিত বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন তাঁরা। বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত যত দিন থাকবে, তত দিন আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়তে থাকবে। সোনাকে সাধারণত মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের বৃহত্তম সোনার রিজার্ভ রয়েছে। দেশটির কাছে মোট ৮ হাজার ১৩৩ টন (৮১ লাখ ৩৩ হাজার কিলোগ্রামের বেশি) সোনা আছে, যা তাদের মোট বিদেশি সম্পদের ৭৮ শতাংশ।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ১৬ হাজার ৪০০ টন সোনা থাকবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ৮৮০ টন (৮ লাখ ৮০ হাজার কিলোগ্রাম) সোনার রিজার্ভ রয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, ভারতের কাছে ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের সোনা রয়েছে এবং এটি ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ১৩ শতাংশ।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১৪ দশমিক ৮ টন (১৪ হাজার ৮০০ কিলোগ্রাম) সোনার রিজার্ভ রয়েছে। এটি দেশের মোট রিজার্ভের পাঁচ দশমিক ছয় পাঁচ শতাংশ। পাকিস্তানের কাছে ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের ৬ দশমিক চার টন (৬ হাজার ৪০০ কিলোগ্রাম) সোনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেন সোনা কিনছে?
অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিদেশি মুদ্রা, অর্থাৎ ডলারে না রেখে সোনায় রূপান্তর করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদার ফলে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ছে।
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে মোট ৩৬ হাজার ২০০ টন (৩ কোটি ৬২ লাখ কিলোগ্রাম) সোনার রিজার্ভ ছিল, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা সম্পদের ২০ শতাংশ। ২০২৩ সালে সোনা আকারে সুরক্ষিত সম্পদের হার ছিল ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে চীন, তুরস্ক, ভারত, ইরাক এবং আজারবাইজান সেই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যারা এক বছরে ২০ টন (২০ হাজার কিলোগ্রাম) সোনা কিনেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের দুর্বল হয়ে পড়া, যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা– বিনিয়োগকারী ও দেশগুলোকে সোনার কিনতে আগ্রহী করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, বিবিসি, রয়টার্স, ডয়চে ভেলে, দ্য ইকোনমিক টাইমস