বাংলাদেশ কিনছে ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান: কী আছে এতে?

ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান কিনতে গতকাল মঙ্গলবার ইতালির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিওনার্দো এসপিএ-র সঙ্গে লেটার অব ইন্টেন্ট (সম্মতিপত্র) সই করেছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। গত অক্টোবরে চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের ২০টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কিনতে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ, এরপর ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার এই চুক্তিপত্রের ঘোষণা বোঝায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমানের দিক থেকে আধুনিকায়নের পথে হাঁটছে।

চুক্তিপত্রের ঘোষণায় অবশ্য কতটি ইউরোফাইটার কেনা হবে, এ ব্যাপারে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

তা এই ইউরোফাইটার টাইফুন কী ধরনের যুদ্ধবিমান? কী কী আছে এতে? জে-১০সি বা রাফালের মতো যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনায় এতে কী কী বাড়তি বা কম আছে?

 

টাইফুন কী

ইউরোফাইটার টাইফুনকে একটি মাল্টি-রোল ফাইটার জেট বলা হয়। অর্থাৎ একই যুদ্ধবিমান আকাশে শত্রু বিমানের মোকাবিলা যেমন করতে পারে, তেমনি আকাশ থেকে মাটিতে থাকা লক্ষ্যে আঘাতও করতে পারে। দুটি কাজ একসঙ্গেও করতে পারে।

টাইফুন মূলত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের একটি যৌথ প্রজেক্ট। ফিউজালাজ বা মূল অংশ তৈরি হয় যুক্তরাজ্যে। ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি হয় জার্মানিতে। সেন্সর হাউজিং, ফ্লাইট কন্ট্রোল সারফেইস তৈরি হয় ইতালিতে। উইং, ফ্ল্যাপ, ইলেকট্রনিক সিস্টেম তৈরি হয় স্পেনে। সর্বশেষ পর্যায়ের অ্যাসেম্বলিংয়ের কাজ হয় যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে। 

এর ইঞ্জিন ইজে২০০-ও ইউরোপে এই চার দেশের কোম্পানিগুলো তৈরি করে।

ইউরোফাইটার টাইফুন কিনছে বাংলাদেশ। ছবি: এক্স

 

কোন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান

ফ্রান্সের রাফাল বা চীনের জে-১০সি-র মতো টাইফুনও ৪.৫ প্রজন্মের ফাইটার জেট। অর্থাৎ, এটি এফ-১৬ বা জে-১০ সিরিজের আগের মডেল জে-১০এ-র (বাংলাদেশ গত অক্টোবরে এই সিরিজের পরের দিকের মডেল জে-১০সি কেনার ঘোষণা দিয়েছে) মতো চতুর্থ প্রজন্মের ফাইটার জেটের চেয়ে ক্ষমতায় এগিয়ে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ বা চীনের জে-২০ সিরিজের মতো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেটের মতো রাডার থেকে লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা (স্টেলথ মোড) টাইফুনে নেই। দুইয়ের মাঝামাঝিতে টাইফুনের অবস্থান – যথেষ্ট শক্তিশালী, গতিময়, অনেক আধুনিক এবং আকাশে যুদ্ধের ক্ষেত্রে অসাধারণ ক্ষমতা আছে টাইফুনের।

 

কী কী আছে

-        এতে দুটি ইজে২০০ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন আছে। এর ফলে যুদ্ধবিমানটি প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে উড়তে পারে, ম্যানুভার বা দ্রুত দিকবদল করতে পারে, প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখ থেকে দ্রুত সরে যেতে পারে।

-        গতি টাইফুনের সবচেয়ে বড় ক্ষমতাগুলোর একটি। এই যুদ্ধবিমানের গতি উঠতে পারে ২ মাখ (ঘণ্টায় প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার)। শত্রু বিমানকে ধাওয়া করা কিংবা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই গতি খুব কাজে আসে। তুলনার ক্ষেত্রে বলা যায়, রাফালের গতি সর্বোচ্চ ১.৮ মাখ (২২২২ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। জে-১০সি-র গতি ১.৮ মাখ বলা হলেও এটি ২.২ মাখ পর্যন্তও যেতে পারে। 

-        এটি ৫৫ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় উড়তে পারে। তুলনার ক্ষেত্রে বলা যায়, রাফালের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ হাজার ফুট। জে-১০সি ৫৯ হাজার ফুট পর্যন্ত উঠতে পারে।

-        ডেল্টা ক্যানার্ড ডিজাইন এবং ফ্লাই-বাই-ওয়্যার কন্ট্রোলের কারণে টাইফুন দ্রুত ম্যানুভার করতে পারে, নানা কলাকৌশলে ও দ্রুত দিক বদল করে প্রতিপক্ষকে ধন্দে ফেলতে পারে।

-        এতে অস্ত্র সংযুক্ত করার জন্য ১৩টি হার্ডপয়েন্ট থাকে। প্রায় ৭৫০০ কেজি ওজন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে টাইফুন।

 

দেখা, আঁচ করা ও নিজেকে প্রতিরক্ষার ক্ষমতা

শত্রু বিমানকে খুঁজে বের করা এবং নিজের প্রতিরক্ষার জন্য টাইফুনে আধুনিক এএসইএ (অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে) রাডার, পাইরেট ইনফ্রারেড ও প্রেটরিয়ান ডিফেন্স সিস্টেম আছে। এই তিনটি প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলে টাইফুনকে বিশ্বের ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রার্থিত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি বানিয়েছে।

সহজ ভাষায় বললে, এএসইএ রাডার কাজ করে ফাইটার জেটের সদাজাগ্রত চোখের মতো। অনেক দূর থেকে একাধিক শত্রু ফাইটার জেটকে খুঁজে বের করতে পারে, প্রতিকূল আবহাওয়াতেও দারুণ কাজ করতে পারে, প্রতিপক্ষের ধেয়ে আসতে থাকা মিসাইল একেবারে সঙ্গে সঙ্গে (রিয়েল টাইমে) চোখে চোখে রাখতে পারে।

পাইরেট ইনফ্রারেড সিস্টেমের কারণে টাইফুন ফাইটারজেট প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানের যেকোনো তাপনির্গমণকারী সিগন্যাল ধরে সেটির অবস্থান বের করে ফেলতে পারে – সেটা ইঞ্জিনের ধোঁয়া হোক, গরম হয়ে পড়া মেটাল হোক, এমনকি শরীরের তাপই হোক। কিন্তু এই সিস্টেমের কারণে টাইফুনের ভেতর থেকে এমন কোনো হিট সিগন্যাল বাইরে যায় না, ফলে প্রতিপক্ষের ফাইটার জেটের জন্য এটিকে হিট সেন্সরের মাধ্যমে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। সহজ ভাষায়, নিজে লুকিয়ে থেকে অন্যকে খুঁজে বের করতে পারে টাইফুন।

প্রেটরিয়ান ডিফেন্স সিস্টেম এক কথায় টাইফুনের নিজস্ব বডিগার্ডের কাজ করে। প্রতিপক্ষ যুদ্ধবিমানের রাডার যখন টাইফুনের দিকে লক্ষ্য নির্দিষ্ট (লক) করে, এই প্রেটরিয়ান ডিফেন্স সিস্টেমের কারণে টাইফুন যুদ্ধবিমান দ্রুত পাইলটকে সতর্কবার্তা দেয়, প্রতিপক্ষের রাডারকে জ্যাম করে, এমনকি ফ্লেয়ার ছুঁড়ে প্রতিপক্ষের দিক থেকে ধেয়ে আসতে থাকা মিসাইলকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

রাফাল ও জে১০সি-র সঙ্গে তুলনা

জে-১০সি কেনা ও পরিচালনায় খরচ অনেক কম। তবে দুটি ইঞ্জিন থাকায় টাইফুন ফাইটার জেট জে-১০সি-র চেয়েও (জে১০সি-তে একটি ইঞ্জিন) দ্রুতগতিতে উঁচুতে উড়তে পারে এবং অল্প সময়ে উচ্চগতিতে পৌঁছাতে পারে। জে-১০সি-র চেয়ে দ্রুতগতিতে দিক বদলাতে পারে টাইফুন, এবং সে সময়েও উচ্চগতি ধরে রাখতে পারে। তবে জে-১০সি আধুনিক রাডার ও মিসাইলের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সহজ ভাষায়, দুই ফাইটার জেটই সর্বোচ্চ ক্ষমতায় যুদ্ধে নামলে টাইফুন এগিয়ে থাকবে, তবে ক্ষমতার সঙ্গে খরচও বিবেচনায় নিলে জে-১০সি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। 

রাফাল আর টাইফুনকে কাছাকাছি ক্ষমতার ফাইটারজেটই মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে রাফাল অপেক্ষাকৃত কম তেল খরচ করে বেশি ভারী সমরাস্ত্র বহন করতে পারে। অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় রাফালের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার ক্ষমতা বেশি ভালো, হাই অল্টিটিউডে অবশ্য টাইফুন এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি। জে-১০সি-র মতো রাফালের চেয়েও টাইফুন এগিয়ে থাকবে দ্রুতগতি, গতি না হারিয়েও হঠাৎ দিক বদলানোর ক্ষমতার জন্য। সহজ ভাষায়, যদি অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য হয় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বেরিয়ে যাওয়া, সেক্ষেত্রে রাফাল এগিয়ে থাকবে। তবে আকাশপথে সম্মুখযুদ্ধ, টাইফুনের ভালো করার সম্ভাবনা বেশি। 

যদিও যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে এভাবে সরাসরি তুলনা চলে না। কোন যুদ্ধবিমান কী ধরনের কৌশলে ব্যবহৃত হচ্ছে, পাইলটের দক্ষতা, কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কাজে লাগানো হচ্ছে – সবকিছু মেলানোর আগে যুদ্ধবিমানের ক্ষমতার তুলনা করা অযৌক্তিকই বটে।

 

খরচ কেমন, সেখানে যা ভাবার বিষয়

ফাইটার জেটের ক্ষেত্রে মূল খরচ কত সেটা ফাইটার জেটের কনফিগারেশনের বিভিন্ন দিকের ওপর (রাডার কী হবে, সমরাস্ত্র কোন ধরনের হবে, সেন্সর কোন প্রজন্মের হবে) নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে বললে ইউরোফাইটার টাইফুনের একেকটি ইউনিটের খরচ দাঁড়ায় ৯ কোটি থেকে ১২ কোটি মার্কিন ডলার। যেখানে রাফালের খরচ ১১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। জে-১০সি-র খরচ ৬ কোটি মার্কিন ডলারের আশপাশে।

তবে এই খরচ হচ্ছে একেবারে ‘বেইজ’ বা সাধারণ খরচ। কিন্তু অন্য দেশ থেকে ফাইটার জেট কেনার ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অস্ত্রের প্যাকেজ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তিসহ বিভিন্ন খরচ যোগ করতেই হয়। তাতে ক্ষেত্রবিশেষে খরচের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বা এরও বেশি হয়ে যেতে পারে। 

 

বাংলাদেশের জন্য টাইফুন কীভাবে কার্যকর হতে পারে

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হাতে থাকা যুদ্ধবিমানের তালিকায় এতদিন মিগ-২৯, এফ-৭-এর মতো পুরোনো প্রজন্মের ফাইটার জেটের কথাই বেশি শোনা যেত। সে জায়গায় একদিকে জে-১০সি এবং এর সঙ্গে টাইফুনও যুক্ত হওয়া বিমানবাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। টাইফুন ওড়ার ক্ষেত্রে রানওয়ের দৈর্ঘ্য কম হলেও চলে, অনেক ক্ষেত্রে ১ কিলোমিটারেরও কম রানওয়ে থেকেও টাইফুন উড়তে পারার উদাহরণ আছে। সে ক্ষেত্রে কুর্মিটোলাসহ বিমানবাহিনীর ঘাঁটিগুলো সহজেই টাইফুন কাজে লাগাতে পারার কথা।

তবে টাইফুন ‘একবার কিনে আর কিছু করতে হবে না’ ঘরানার যুদ্ধবিমান নয়। সাধারণত এই যুদ্ধবিমানের চুক্তিতেই দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থাকে। পাশাপাশি শুধু যুদ্ধবিমানের নিজের ক্ষমতা নয়, এর সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র কী ধরনের কেনা হচ্ছে, তার ওপরও যুদ্ধবিমানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নির্ভর করে – টাইফুনের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়।