২০১৮ সালের সেই ভয়াবহ ৭৩৭ ম্যাক্স সংকট। এরপর কেটে গেছে সাতটি বছর। একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি, উৎপাদন বন্ধ এবং বিশ্বজুড়ে আস্থার সংকটে বোয়িং যেন তলিয়ে যাচ্ছিল এক অতল গহ্বরে। কিন্তু এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে যা ঘটল, তাকে অভাবনীয় বলাই যায়। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় জায়ান্ট এয়ারবাসকে টপকে উড়োজাহাজ সরবরাহের শীর্ষে উঠে এসেছে বোয়িং। কীভাবে বোয়িং এই অসাধ্য সাধন করল এবং কেনই বা এয়ারবাসের মতো জায়ান্ট এখন পিছিয়ে পড়ছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
এ বছরের প্রথম তিন মাসে বোয়িং মোট ১৪৩টি উড়োজাহাজ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি। বোয়িংয়ের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই মডেল, ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও এই দুটি মডেলের ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
এক বছর আগেও বোয়িং যেখানে প্রায় তলিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে এই কামব্যাক কীভাবে? মূলত কয়েকটি উদ্যোগের কারণেই বোয়িংয়ের এই ফিরে আসা।
- মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএএ বোয়িংয়ের ওপর থেকে উৎপাদনের বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে।
- এ বছরের শুরু থেকে বোয়িং প্রতি মাসে অন্তত ৪২টি করে উড়োজাহাজ উৎপাদন করছে।
- এবং, ৭৩৭ ম্যাক্স–৭ ও ম্যাক্স–১০, এই নতুন দুই মডেলের সার্টিফিকেশন এখন শেষ পর্যায়ে।
এয়ারবাসের এই ছন্দপতন কেন?
ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে এয়ারবাসের ক্ষেত্রে। গত বছরের তুলনায় তাদের ডেলিভারি ১৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১৪টিতে। এয়ারবাসের এই সংকটের মূল কারণ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং ইঞ্জিন সংকট।
প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
১. প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিন: প্রতিষ্ঠানটির গিয়ার্ড টার্বোফ্যান ইঞ্জিনের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে।
২. গ্রাউন্ডেড ৫৫০ উড়োজাহাজ: নতুন উড়োজাহাজ তৈরির চেয়ে পুরনো এই ৫৫০টি বিমানের ইঞ্জিন মেরামতকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে এয়ারবাসকে।
৩. মজুদ বিমান: এয়ারবাসের অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে উড়োজাহাজ বের হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ইঞ্জিন না থাকায় সেগুলো রানওয়েতে অলস পড়ে থাকছে।
এয়ারবাসের সিইও গুইলাম ফাউরি নিজেই স্বীকার করেছেন, বছরের এই শুরুটা ছিল তাদের জন্য স্মরণকালের সবচেয়ে কঠিন সময়। এর ফলে কোম্পানির মুনাফা এক ধাক্কায় ৫২ শতাংশ কমে ৩০০ মিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে।
এয়ারবাস কী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
একটি কোয়ার্টারে পিছিয়ে পড়লেও এয়ারবাসের হাতে এখনো অস্ত্রের অভাব নেই। এয়ারবাসের মোট অর্ডারের পরিমাণ বা ব্যাকলগ এখনও বোয়িংয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এয়ারবাসের হাতে বর্তমানে ৭ হাজার ১০০টির বেশি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের অর্ডার আছে। আর বোয়িংয়ের আছে মাত্র ৪ হাজার ৮০০টি।
এয়ারবাসের লক্ষ্য ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ৮৭০টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করা। এতে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে ৭৫টি করে উড়োজাহাজ উৎপাদন করতে হবে। অন্যদিকে, বোয়িংয়ের লক্ষ্য ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি মাসে ৫২টি উড়োজাহাজ উৎপাদন করার।
বোয়িংয়ের এই জয়রথ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? নাকি এয়ারবাস দ্রুত তাদের ইঞ্জিন সমস্যা মিটিয়ে আবারও শীর্ষে আসবে? বিমান শিল্পের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে বোয়িংয়ের হারানো আস্থার পুনর্গঠন, অন্যদিকে এয়ারবাসের সাপ্লাই চেইন সামলানোর চ্যালেঞ্জ।



