একের পর এক রেকর্ড গড়েই চলেছে সোনার দাম। বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশের বাজারেও প্রতিদিন আরও দামি হচ্ছে সোনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক কেনাকাটা এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে সোনার দাম আরও বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সোমবার স্পট মার্কেটে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি এ বছরেই ৬ হাজার ডলার ছাড়াবে।
নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত মূল্যবান এই ধাতুটির দাম এরই মধ্যে ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালে দাম বৃদ্ধির হার ছিল ৬৪ শতাংশ।
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলবিএমএ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। গড় দাম হতে পারে ৪ হাজার ৭৪২ ডলার।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, এ বছরের ডিসেম্বরে সোনার দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলার হতে পারে। আর বিশ্লেষক রস নরম্যানের হিসেবে, এ বছর সোনার সর্বোচ্চ দাম হতে পারে ৬ হাজার ৪০০ ডলার।
রস নরম্যান বলেন, ‘এই মুহূর্তে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো অনিশ্চয়তা। আর সেটাই সোনার পক্ষে কাজ করছে।’
যে কারণে বাড়ছে সোনার দাম
সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দাম এত বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা। এর মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর টানাপোড়েন, শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে বাড়তে থাকা সংশয়।
মেটালস ফোকাসের পরিচালক ফিলিপ নিউম্যান বলেন, ‘সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি অতিমূল্যায়িত শেয়ারবাজার নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের সোনার দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়ানোর পর আমরা মনে করছি এতে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা যেতে পারে।’
গত বছর সোনার দাম বৃদ্ধির একটি বড় কারণ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক কেনাকাটা। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চলতি বছরেও এই ধারা বজায় থাকবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি মাসে গড়ে ৬০ মেট্রিক টন সোনা কিনতে পারে। পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গত বছরের শেষ নাগাদ ৫৫০ টন সোনা মজুত ছিল। এ বছর এটি ৭০০ টনে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির গভর্নর আদাম গ্লাপিনস্কি।
বিশ্লেষক রস নরম্যান বলেন, ‘সোনার দাম বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ডলার-নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা। আর সোনা ছাড়া তাদের আর কোথায়ই বা যাওয়ার আছে?’
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত টানা সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে। সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) বিনিয়োগ প্রবাহও দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার এ বছর আরও কমবে।
উচ্চ দামের কারণে সোনার গয়নার চাহিদা কিছুটা কমেছে। তবে ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে ছোট সোনার বার ও কয়েনের চাহিদা বেড়েছে, যা গয়নার চাহিদার ঘাটতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপেও বার ও কয়েন কেনার এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
নুমিসমাটিকা জেনেভেনসিসের বিক্রয় প্রধান ফ্রেডেরিক পানিজুত্তি বলেন, ‘অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে সোনার আকর্ষণ এর সরলতায়। ব্যালান্সশিট বিশ্লেষণ, ঋণঝুঁকি বা রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি নিয়ে ভাবতে হয় না। এই ধাতু রাখার একমাত্র ঝুঁকি হলো দামের ওঠানামা। আর বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি যত জটিল হচ্ছে, এই সরলতা তত বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।’
সোনার ভবিষ্যৎ তবে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি বিষয় সোনার দামে সাময়িক পতন ঘটাতে পারে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রে সুদ কমানোর প্রবণতা কমে যাওয়া বা শেয়ারবাজারে মার্জিন কল। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এমন কোনো পতন হলে তা হবে সাময়িক। আর বিনিয়োগকারীরা সেটিকে সোনা কেনার একটি সুযোগ হিসেবেই গ্রহণ করবেন।
ফিলিপ নিউম্যান বলেন, ‘সোনার দামে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের পতন হতে হলে আগে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে হবে। বর্তমানে এমন পরিস্থিতি অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে।’