বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মেগা ইভেন্ট— ফুটবল বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাই এখন একটাই উন্মাদনা- বিশ্বকাপ। ৩টি দেশ, ১৬টি শহর, ৪৮টি দল আর রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ! স্বাভাবিকভাবেই ফিফার পকেটে ঢুকছে রেকর্ড পরিমাণ টাকা। ২০২৬ থেকে ২০৩০- এই চার বছরের সাইকেলে ফিফার আনুমানিক আয় হবে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত কাতার বিশ্বকাপের আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশি মুদ্রায় অংকটা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
প্রশ্ন হচ্ছে, ফিফার পকেট তো ভরছে, কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের টাকা আসছে কোথা থেকে? আজ আমরা এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।
ডাইনামিক প্রাইসিং ও টিকিটের চড়া দাম
এবারের বিশ্বকাপে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে টিকিটের দামে। ফিফা এবারই প্রথম চালু করেছে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং অ্যালগরিদম’। সহজ ভাষায়, বিমানের টিকিটের মতো চাহিদা যত বাড়বে, টিকিটের দামও তত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে।
২০১৮ সালে যখন এই ৩ দেশ যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য বিড করেছিল, তখন ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৫০ ডলার। আর গত বছরের অক্টোবর নাগাদ সেই টিকিটের দাম উঠে যায় ১৩ হাজার ৬৫০ ডলারে। এমনকি খেলা শুরুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে ফাইনালের কয়েকটি অবশিষ্ট টিকিটের একেকটির দাম উঠেছে ৭ হাজার ২৫৬ ডলারেরও বেশি! আর রিসেল বা কালোবাজারে গ্রুপ পর্বের এক একটি সাধারণ সিটের গড় দামই এখন ৬৩৬ ডলার— যা কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
ভক্তদের পকেট কাটার হিসাব
ধরুন, কোনো ইংলিশ সমর্থক যদি গ্রুপ পর্বে নিজের দেশের সব ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে দেখতে চান, তবে তার পকেট থেকে খসবে প্রায় ১১ হাজার ১৯৭ ডলার- যা যুক্তরাজ্যের একজন নাগরিকের গড় বার্ষিক আয়ের প্রায় চারভাগের একভাগ (২২ দশমিক ৬ শতাংশ)।
আবার ধরুন, গ্রুপ পর্বের ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচটি দেখতে চাইছেন একজন সমর্থক। এই ম্যাচের একটি টিকিটের দাম এখন ১ হাজার ৮৬২ ডলারের বেশি। এটা মরক্কোর একজন সাধারণ ব্যক্তির ৫ মাসের বেতন। আর ব্রাজিলের ন্যূনতম মজুরি পাওয়া একজন কর্মীর ৬ মাসের পুরো বেতন দিয়েও এই ম্যাচের একটি টিকিট কেনা সম্ভব নয়।
ট্রাভেল, হোটেল ও স্টেডিয়ামের খরচ
খরচ শুধু টিকিটেই শেষ নয়। নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশন থেকে খেলা দেখার জন্য মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাওয়ার ট্রেনের স্বাভাবিক ভাড়া যেখানে মাত্র ১৩ ডলার, ম্যাচ ডে-তে তা ৭ গুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯৮ ডলার। বোস্টনেও ট্রেনের ভাড়া ২০ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ ডলার।
খেলা দেখতে গিয়ে যদি স্টেডিয়ামে এক বোতল পানি কিনতে চান, তবে গুনতে হবে সাড়ে ৭ ডলার। অর্থাৎ, ৯০০ টাকারও বেশি। আমেরিকার স্টেডিয়ামগুলোতে শুধু খাবার আর পানীয়র পেছনেই একজন সমর্থকের গড়ে ৩২ থেকে ৩৪ ডলার খরচ হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর আছে হোটেলের খরচ। ম্যাচ নাইটে হোটেলগুলোর ভাড়া সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
পরিবেশের ক্ষতি: আসল খেসারত দিচ্ছে পৃথিবী
টাকা-পয়সার হিসেবতো হলো। এবার জানা যাক আসল খেসারতের কথা, যা টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। এই খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে। বিশ্বকাপের মতো বিশালাকার একটি টুর্নামেন্ট যখন পুরো মহাদেশজুড়ে হয়, তখন দল আর ভক্তদের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য শত শত বাড়তি ফ্লাইট নিতে হয়।
গবেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৯০ লক্ষ টন, যেটা ২০১৮ বিশ্বকাপে ছিল ২১ দশমিক ৭ লক্ষ টন, আর কাতারে ছিল ৩১ দশমিক ৭ লক্ষ টন।
ইংল্যান্ডের কোনো ভক্ত যদি তার দলকে অনুসরণ করে ফাইনাল পর্যন্ত যান, তবে তিনি একাই ৩ দশমিক ৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে ভূমিকা রাখবেন, যা দিয়ে ইংল্যান্ডে একটি সাধারণ বাড়ি টানা ১৯ মাস উত্তপ্ত রাখা সম্ভব।
আর এই বাড়তি উত্তাপের প্রভাব পড়ছে ফুটবল মাঠেও। বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ৪ ম্যাচের ১টি এমন তাপমাত্রায় খেলা হবে, যা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
খেলোয়াড়দের ইনজুরি ও ক্লান্তি
এই সুপারসাইজড বিশ্বকাপের চড়া মূল্য খেলোয়াড়দের দিতে হচ্ছে নিজেদের শরীর দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে স্পেনের মার্টিন জুবিমেন্ডির কথাই ধরা যাক। আর্সেনালের এই মিডফিল্ডার এই মৌসুমে রেকর্ড ৬৭টি ম্যাচ খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল শেষ করেই তাকে যোগ দিতে হয়েছে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে হলে জুবিমেন্ডির মতো ফুটবলারদেরকে ক্লান্ত পা নিয়েই আরও ৮টি ম্যাচ লড়াই করতে হবে।
ক্লাব আর আন্তর্জাতিক ফুটবলের ক্রমবর্ধমান চাপে অতিরিক্ত খেলার ধকল নিতে না পেরে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ব্রাজিল হারিয়েছে তাদের তিন তারকা ফুটবলার: রদ্রিগো, এস্তেভাও এবং মিলিতাও-কে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শো-টি এবার মঞ্চস্থ হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ক্লান্ত একঝাঁক খেলোয়াড়দের নিয়ে।
ফুটবল মাঠের ৯০ মিনিটের রোমাঞ্চের আড়ালে এই হলো বিশ্বকাপের আসল অর্থনীতি আর সমীকরণ। ফিফার ব্যাংক ব্যালেন্স হয়তো ফুলেফেঁপে উঠছে, কিন্তু তার আসল মূল্যটা দিচ্ছে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা তাদের পকেট থেকে, ফুটবলাররা তাদের শরীর দিয়ে, আর আমাদের এই প্রিয় পৃথিবী ক্রমশ হয়ে উঠছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। এই চড়া মূল্য চুকিয়ে এবারের বিশ্বকাপ কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মেগা ইভেন্ট— ফুটবল বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাই এখন একটাই উন্মাদনা- বিশ্বকাপ। ৩টি দেশ, ১৬টি শহর, ৪৮টি দল আর রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ! স্বাভাবিকভাবেই ফিফার পকেটে ঢুকছে রেকর্ড পরিমাণ টাকা। ২০২৬ থেকে ২০৩০- এই চার বছরের সাইকেলে ফিফার আনুমানিক আয় হবে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত কাতার বিশ্বকাপের আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশি মুদ্রায় অংকটা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
তথ্যসুত্র: আলজাজিরা, আনাদলু অ্যাজেন্সি, বিইনস্পোর্টস, ডয়চে ভেলে, ব্রিটানিকা, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস



