মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধে কার্যত বন্ধ হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালী খুলতে তাঁর আবদারের পরও ইউরোপীয় সদস্যরা যেহেতু জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি, তার জেরে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশের সামরিক এই জোট নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা অনেক পুরোনো, নতুন ঘোষণায় সমালোচনাটা আরও তীব্র হয়েছে আর কী। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ন্যাটো থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ও বলেছেন ট্রাম্প।
কিন্তু ট্রাম্প কি চাইলেই ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে যেতে পারবেন? তাঁর গতকালের ঘোষণার পর এই প্রশ্নটা উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প একক সিদ্ধান্তে ৭৭ বছর পুরোনো এই ট্রান্স-আটলান্টিক জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বড় সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রায়ই নেন বটে - যার কিছু আবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আটকেও গেছে, তবে ন্যাটো নিয়ে প্রশ্নে সংশয়টা থাকছেই।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইন, ন্যাটোর বিধান কী বলছে? সংবাদসংস্থা রয়টার্স খুঁজেছে সে প্রশ্নের উত্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কী বলে?
আন্তর্জাতিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট কী করতে পারেন, সে ব্যাপারে মার্কিন সংবিধান পথ দেখাতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ১০০ সদস্যের সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধান কী, সে ব্যাপারে মার্কিন সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই।
ন্যাটো চুক্তিতে কী বলা আছে?
ইউরোপীয় বেশ কয়েকটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে নিয়ে ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করা। এরপর থেকে পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হয়ে আছে এই জোট।
১৯৪৯ সালের উত্তর আটলান্টিক চুক্তির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশ চাইলে এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে জানিয়ে জোট থেকে সরে যেতে পারে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র অন্য সদস্য দেশগুলোকে সেই সিদ্ধান্তের কথা জানাবে।
এ পর্যন্ত কোনো ন্যাটো সদস্য দেশ তাদের সদস্যপদ বাতিল করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন কী বলে?
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেস একটি আইন পাস করে, যা পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্বাক্ষর করেন। এই আইনে বলা হয়েছে, ১০০ সদস্যের সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে পারবেন না।
এই আইনটি ২০২৪ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ)-এর সংশোধনী হিসেবে যুক্ত করা হয়। পেন্টাগনের নীতি কী হবে, সেটা ঠিক করে দেয় এই বিশাল বার্ষিক বিলটি (এনডিএএ)। সংশোধনীটির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন এবং তৎকালীন রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও।
রুবিও বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত মঙ্গলবার রুবিও-ই বলেছেন, ইরান যুদ্ধের পর ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে ওয়াশিংটনকে। ইরানের ওপর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়।
এনডিএএ সংশোধনীতে এটাও বলা আছে যে, ন্যাটো থেকে বের হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
ট্রাম্প কী বলেছেন?
ট্রাম্প বহু বছর ধরেই ন্যাটোর কড়া সমালোচক। ২০২০ সালে তাঁর প্রথম মেয়াদের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের লিগ্যাল কাউন্সেল তাদের মতামত প্রকাশ করে এই বলে যে, চুক্তি থেকে বের হওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের, কংগ্রেসের নয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি আদালতে গেলে নির্বাহী বিভাগ ওই মতামতের ভিত্তিতে যুক্তি দেখাতে পারে যে, এনডিএএ সংশোধনীটি অসাংবিধানিক।
বুধবার রয়টার্সকে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি যে তিনি ‘পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে’ বিবেচনা করছেন, সেটা তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে স্পষ্ট করে জানাবেন। ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তখন ট্রাম্প বলেছেন, ন্যাটোর ওপর তাঁর ‘বিতৃষ্ণা’ জন্মে গেছে।
ন্যাটো ছাড়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের ঘোষণা এসেছে এমন সময়, যখন এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সংবাদ সম্মেলনে ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এখনো একইরকম অঙ্গীকারাবদ্ধ কি না – এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে বলটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোর্টে ঠেলে দিয়ে হেগসেথ বলেছেন, ‘ন্যাটোর ব্যাপারে বললে…এই সিদ্ধান্তটা প্রেসিডেন্টই নেবেন। আমি শুধু এতটুকুই বলব যে, অনেক কিছুই চোখের সামনে ধরা পড়ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনি বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এই অঙ্গীকারের অভাবই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এবং সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনী যদি ন্যাটো ও ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না থাকে, তাহলে কংগ্রেসের পক্ষে তা ঠেকানো খুব কঠিন।’
সামনে কী হতে পারে?
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণত কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যদি সেই চুক্তিতে তা অনুমোদিত থাকে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। অতীতে প্রেসিডেন্টরা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই একাধিক চুক্তি থেকে সরে গেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ২০২০ সালে ট্রাম্পের ওপেন স্কাইজ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা। এই চুক্তিতে সদস্য দেশগুলোর ওপর নিরস্ত্র নজরদারি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ ছিল।
ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আদালতে গেলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা সহজ হবে না। সেখানে একটা বড় প্রশ্ন দাঁড়াবে এটা যে — কে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করার বৈধ অধিকার রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষেই রায় দিয়েছেন তাঁরা। এখনো কোনো চুক্তি থেকে প্রত্যাহার সংক্রান্ত মামলার মূল বিষয় নিয়ে শুনানি তাঁরা করেননি।