ট্রাম্পের চাপে লেবাননে যুদ্ধবিরতি, কতটা কোণঠাসা নেতানিয়াহু?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক কূটনীতি ও চাপের মুখে আবারও নতি স্বীকার করতে হলো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের অনড় অবস্থানের কারণে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র আধিপত্যকেই আবারও স্পষ্ট করে তুলল। এ বিষয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

প্রতিবেদনে বলা হয়– প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ফোনালাপের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা শেষ পর্যন্ত হয়নি, তবে এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে সে বিষয়ে তিনি কোনো সন্দেহ রাখেননি। গত ১৬ এপ্রিল সকালে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের সঙ্গে কথা বলবেন। দশকের পর দশক ধরে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা প্রতিবেশী দুই দেশের নেতাদের মধ্যে এটিই হতে পারত প্রথম সরাসরি যোগাযোগ। ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, এটি সামান্য স্বস্তির সুযোগ তৈরি করবে।

কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহর চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আউন সেই প্রস্তাবিত ফোনালাপ প্রত্যাখ্যান করেন। অবশ্য ট্রাম্প সেই আলাপের জন্য অপেক্ষা করেননি।

কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, মধ্যরাত থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হবে। আর নেতানিয়াহুর সামনে তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এটি সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেখানে ট্রাম্পের ঘোষণা তাঁর সম্ভবত সবচেয়ে সোচ্চার আন্তর্জাতিক সমর্থককে কোণঠাসা করে ফেলে; যা নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অনুমতির ওপর ভিত্তি করে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। 

নেতানিয়াহু নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে– অর্থাৎ তাঁর ও ট্রাম্পের মধ্যেকার নিবিড় সমন্বয়ের প্রশংসা করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছেন।

এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে নেতানিয়াহু অঙ্গীকার করেছিলেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলবে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এটি এখনো শেষ হয়নি।’ ১৫ এপ্রিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির বলেছিলেন, তিনি লেবানন ও ইরানে আরও যুদ্ধ পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছেন।

কিন্তু ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়া নেতানিয়াহুর সামনে কৌশলে এগোনোর খুব একটা সুযোগ নেই। যদিও এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ১০ দিন স্থায়ী হওয়ার কথা, তবে এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্প এটি কার্যকর রাখতে চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দম্ভ করে বলেন, ‘সারা বিশ্বে ৯টি যুদ্ধ সমাধান করা আমার জন্য সম্মানের বিষয় ছিল এবং এটি হবে আমার দশম।’

১৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে ইসরায়েলি নেতারা সাময়িক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে সেখানে কোনো ভোটাভুটি হয়নি এবং যুদ্ধ শেষ হতে মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতে পারে, এমন কোনো স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। এর পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে নেতানিয়াহু আবারও রিমোট আলোচনার জন্য তাঁর নিরাপত্তা পরিষদকে ডাকেন।

ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও সাধারণ নাগরিক– উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে নয়, বরং ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে জানতে পারেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, ‘যুদ্ধের এই পর্যায়ে, যেটিতে তিনি মূলত নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে ট্রাম্পই এখন চূড়ান্ত, যদি না একচেটিয়া বিচারক হয়ে উঠেছেন। গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধ যেভাবে ট্রাম্প জোরপূর্বক শেষ করেছিলেন, ঠিক একইভাবে এখন তিনি ইরান ও লেবাননে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দিয়েছেন।’

বার বার নেতানিয়াহুকে বাধ্য করা
ইরানের সঙ্গে দুটি যুদ্ধসহ অন্তত পাঁচটি পদক্ষেপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন এবং দোহায় হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের একটি ব্যর্থ হামলার জন্য কাতারকে ফোন করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিলেন। লেবানন হলো এর সর্বশেষ উদাহরণ।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসরায়েল সেই নির্ণায়ক বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যা তারা চেয়েছিল এবং যেটির প্রতিশ্রুতি নেতানিয়াহু দিয়েছিলেন। গাজায় যে অর্ধেক উপকূলীয় এলাকা ইসরায়েল দখল করেনি, সেখানে হামাসের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এখনো একটি শক্তিশালী হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে, যারা ইসরায়েলে ড্রোন ও রকেট ছুড়তে সক্ষম। ইরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনামল এখন তাঁর ছেলে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শাসনামলে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রতিটি ফ্রন্টে তাদের আঞ্চলিক দখল বাড়িয়েছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি অঞ্চল রয়েছে এবং অন্তত এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীকে পিছু হটার জন্য হোয়াইট হাউস থেকে কোনো প্রকৃত চাপ নেই। নেতানিয়াহুর জন্য এই ভূখণ্ডগুলো হলো গভীরতর নিরাপত্তা বলয়, যা ইসরায়েল হয়তো বছরের পর বছর ধরে দখল করে রাখবে। কিন্তু এগুলো বিজয়ের চেয়ে অনেক দূরে।

ইসরায়েলের প্রতিপক্ষরা দুর্বল হলেও টিকে আছে

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেছেন, তেহরান পরবর্তী দফার আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান থেকেই অংশ নেবে। সিট্রিনোভিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘প্রতিবেশীদের ওপর এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার সদিচ্ছা ও সক্ষমতা প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে, ওয়াশিংটন থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকি সত্ত্বেও তেহরান কেবল চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে বলে মনে হয় না।’

শুক্রবার নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি তাঁর ‘বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধে’ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, ইসরায়েল পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের এক হাতে অস্ত্র আছে, অন্য হাত শান্তির জন্য বাড়ানো।’

কিন্তু ট্রাম্প এসব পাত্তা দেননি। বিশ মিনিট পর আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল লেবাননে আর কোনো বোমা হামলা চালাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের এমনটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। অনেক হয়েছে, আর নয়!!!’