হরমুজ প্রণালী

যেভাবে বিশ্বকে আঙ্গুলে নাচাচ্ছে ইরান

প্রায় এক মাসেরও বেশি বন্ধ হরমুজ প্রণালী। এতে বিশ্ব তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। আপাতত এই সংকটের কোনো স্পষ্ট সমাধানও নজরে আসছে না।

উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এতটাই বেড়েছে যে, এই সরু জলপথ দিয়ে জ্বালানি তেলসহ পণ্য আনা-নেওয়া প্রায় বন্ধ। এই পথটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বৈশ্বিক কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সারের প্রধান সরবরাহ পথ।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট গভীর হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবরোধ অবসানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন। একই সাথে আবার তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছেন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও ইরানের অবস্থানই বেশি সুবিধাজনক। এর একটি কারণ তাদের অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি এবং অন্যটি এর ভৌগোলিক অবস্থান। এই দুটি বাস্তবতা হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে দিয়েছে।

এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিকূল অবস্থাতেও আয়ের পথ খোলা রেখেছে ইরান। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স গত ২৩ মার্চ একটি প্রতিবেদনে জানায়, অন্তত দুটি জাহাজ পারাপারের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছে। এরপর ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু ট্যাঙ্কারের নিরাপদ পারাপারের জন্য তারা ফি গ্রহণ অব্যাহত রাখবে।

ভৌগোলিক অবস্থান কেন ইরানের পক্ষে?

শিপিং অ্যানালিটিক্স ফার্ম ভর্টেক্সার মতে, হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টটি মাত্র ২৪ মাইল চওড়া। প্রায় সমস্ত ট্রাফিক দুটি প্রধান শিপিং লেনের মধ্য দিয়ে চলাচল করে, যা আরও বেশি সংকুচিত।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, ‘একে চোকপয়েন্ট বলার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশ্বে অনেক চোকপয়েন্ট থাকতে পারে, কিন্তু এটি অনন্যভাবে চ্যালেঞ্জিং, কারণ এর কোনো বিকল্প পথ নেই।’

জাহাজ বা এসকর্ট অপারেশনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এখানে কৌশল পরিবর্তনের জায়গা খুব সীমিত। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সম্পাদক কেভিন রনল্যান্ডস বলেন, ‘খোলা সমুদ্রে সব সময় রুট পরিবর্তনের সুযোগ থাকে; কিন্তু এমন সংকীর্ণ সাগরে এটি প্রায় অসম্ভব। এর মানে হলো ইরানকে তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বেড়াতে হয় না, তারা স্রেফ বসে অপেক্ষা করলেই চলে।’

রনল্যান্ডস একে একটি ‘কিল জোন’ হিসেবে অভিহিত করেন, যেখানে আক্রমণের সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

এছাড়া ইরানের প্রায় এক হাজার মাইল উপকূলরেখা আছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলো মোবাইল বা স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় ধ্বংস করা কঠিন। উপকূলরেখা দীর্ঘ হওয়ার কারণে ইরান প্রণালীর বাইরেও আক্রমণ চালাতে সক্ষম।

জাহাজের জন্য কী হুমকি?

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের প্রচলিত আক্রমণাত্মক সক্ষমতা কিছুটা কমলেও ঝুঁকি একেবারে শূন্য করা অসম্ভব।

রনল্যান্ডসের মতে, জাহাজ পাহারা দেওয়ার অভিযানটি কেবল প্রচলিত যুদ্ধজাহাজের বহর দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য স্যাটেলাইট নজরদারি, টহল বিমান এবং এরিয়াল ড্রোনের সমন্বয়ে একটি ‘লেয়ারড ডিফেন্স’ বা বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

নিক চাইল্ডস জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অনেক নৌ সক্ষমতার অনেকটাই নষ্ট করতে পারলেও আসল হুমকি হলো তাদের অপ্রচলিত অস্ত্রভাণ্ডার। যেমন: বিস্ফোরক ভর্তি ছোট দ্রুতগামী বোট বা ড্রোন। এমনকি সাধারণ দেখতে পাল তোলা নৌকা বা ‘ঢো’ থেকেও মাইন নিক্ষেপ করা সম্ভব। এছাড়া অগভীর জলে চলাচলকারী ছোট ছোট মিজেট সাবমেরিন নিয়ে আমেরিকার দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে।

বর্তমান পরিস্থিতি কী?

ইরান এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের কাছে অন্তত ১৯টি জাহাজে আক্রমণ করেছে। বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য ব্যাহত করার জন্য ইরানকে জাহাজ ধ্বংস করতে হবে না; হুমকির মাত্রা বেশি থাকলেই শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তবে ইরান, চীন, ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু জাহাজ প্রণালীটি পার হতে পেরেছে।

ইরান জানিয়েছে, শত্রু নয় এমন জাহাজগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করলে চলাচল করতে পারবে। লয়েডসের রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত ১৬টি জাহাজ পার হতে পেরেছে, যার মধ্যে একটি ২ মিলিয়ন ডলার ফি দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্যাঙ্কার চলাচল শেষ পর্যন্ত শুরু হলেও জট কাটাতে সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মতে, প্রায় দুই হাজার জাহাজ পারস্য উপসাগরের ভেতরে আটকা পড়ে আছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা বলছে, ইরান তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা নাকচ করছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের বিষয়টি তারা স্বীকার করেছে।

এদিকে হাজার হাজার মার্কিন নৌসেনা ও নাবিক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন কেবল এই শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানের হিসাব-নিকাশ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি অবরোধ চালিয়ে যায় তবে তাদের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত আরও সাইটে হামলা চালানো হবে। গত শুক্রবার মার্কিন সামরিক বাহিনী খার্গ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে, যা ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারের নিয়ন্ত্রিত মূল তেল স্থাপনাগুলোতে এখনও হামলা না হলেও ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে সেগুলো পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে।