ঢাকার রাস্তায় যানজটে প্রতিদিন আমাদের জীবন থেকে কত হাজার ঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে, সে হিসাব কি আছে? যে শহরের গাড়ির গতি এখন মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম, সেই শহরকে বাঁচাতে সরকার নিতে যাচ্ছে এক বড় পদক্ষেপ। সম্প্রতি ঢাকাকে ঘিরে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ‘যানজট শুল্ক’ (কনজেশন চার্জ) আরোপের প্রস্তাব এসেছে। এর মানে হলো, ঢাকার নির্দিষ্ট রাস্তায় গাড়ি নামালে আপনাকে বাড়তি মাশুল বা ট্যাক্স দিতে হতে পারে। কিন্তু কোন কোন গাড়িতে বসবে এই ট্যাক্স? এতে কি আদৌ ঢাকার যানজট কমবে, নাকি উল্টো বাড়বে মানুষের ভোগান্তি?
কেন এই পরিকল্পনার সুপারিশ?
এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে, তা বুঝতে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বিশ্বব্যাংক এবং বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। আর ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ, বিগত ১৫ বছরে ঢাকার গতি কমেছে ১৬ কিলোমিটার। আর এতেই আমাদের জীবন থেকে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এই যানজটের কারণে দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই সরকার ২০২৫ থেকে ২০৪৫ সালের জন্য একটি মেগা প্ল্যান তৈরি করছে, যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এই যানজট শুল্ক।
কোন কোন রাস্তায় এবং কাদের জন্য এই শুল্ক?
এখন প্রশ্ন হলো, এই শুল্ক কি ঢাকার সব রাস্তায় দিতে হবে? উত্তর হচ্ছে—না। এই শুল্ক কার্যকর হবে শুধুমাত্র সেইসব সড়কে, যেখানে বিকল্প হিসেবে উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন—বর্তমানে ঢাকার একমাত্র উপযোগী করিডোর হলো উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল রুট। বর্তমানে চালু থাকা এই মেট্রো ছাড়াও ঢাকায় আরও দুটি মেট্রোরেলের কাজ চলছে এবং পরিকল্পনাধীন আছে আরও তিনটি। এই ৬টি লাইনের বাইরেও ইউআরএসটিপিতে আরও ২টি মেট্রোলাইন এবং ৫টি মনোরেল লাইনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া আছে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডোর এবং কোম্পানিভিত্তিক উন্নত বাস পরিষেবা। এই রুটের ওপর দিয়ে যখনই আপনি প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল কিংবা ট্রাক নিয়ে যাবেন, তখনই আপনাকে এই যানজট শুল্ক দিতে হবে। তবে এই পরিকল্পনার শর্ত হলো, শুল্ক চালুর আগে অবশ্যই জনগণকে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন সুবিধা দিতে হবে।
ট্যাক্স আদায় হবে কীভাবে?
এই ট্যাক্স আদায়ের জন্য রাস্তায় কোনো টোল প্লাজা থাকবে না। ফলে টোল দেওয়ার জন্য নতুন করে কোনো যানজট লাগবে না। পুরো বিষয়টই হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। এতে ব্যবহার করা হবে আরএফআইডি বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন প্রযুক্তি। নির্ধারিত সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো থাকবে আরএফআইডি রিডার। আপনার গাড়িতে থাকা ট্রান্সপন্ডার বা ইউনিফাইড আইডেন্টিফিকেশন নম্বর স্ক্যান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে শুল্কের টাকা কেটে নেওয়া হবে। পুরো ব্যবস্থাটি তদারকি করবে বিআরটিএ এবং ডিটিসিএ। শুধু তাই নয়, ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ এবং ডিটিসিএ যৌথভাবে একটি অত্যাধুনিক ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার গড়ে তুলবে; যেখানে ডিএমপি সামলাবে ট্রাফিক ও দুর্ঘটনা আর ডিটিসিএ নিয়ন্ত্রণ করবে যানজট শুল্ক এবং বাসের রুট ব্যবস্থাপনা।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এই আধুনিক উদ্যোগ নিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক একে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—তা হলো পরিবর্তনশীল শুল্ক ব্যবস্থা। তাঁর মতে, ভোর ৪টায় যখন রাস্তা ফাঁকা, তখন কেউ সড়ক ব্যবহার করলে কেন মাশুল দেবে? মালয়েশিয়াসহ উন্নত বিশ্বে জ্যাম যত বাড়ে, ট্যাক্সের পরিমাণও তত বাড়ে। এর ফলে মানুষ যানজট ও বাড়তি টাকা এড়াতে অফ-পিক আওয়ারে বা ভোরে রওনা দেবে, যা ২৪ ঘণ্টার ট্রাফিককে সুন্দরভাবে বণ্টন করে দেবে। এ ছাড়া এই শুল্ক থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ অন্য কোনো খাতে না নিয়ে, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নেই বিনিয়োগের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
সরকারের সচিব ও ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমানও জানিয়েছেন, ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে এটি একটি যুগান্তকারী অংশ হতে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে এই প্রকল্পটিকে স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০৪৫ সালের মেগা ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে যে বিশাল বাজেটের ঘাটতি রয়েছে, তার একটি বড় অংশ আসবে এই যানজট ট্যাক্স থেকে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহন ব্যবস্থা শতভাগ উন্নত না করে প্রাইভেট কার ও বাইকের ওপর এই যানজট শুল্ক বসালে কি আসলেই জ্যাম কমবে? নাকি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে?



