ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরছে পুরনো ত্রাস?

গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যা। ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় হঠাৎ গুলির শব্দ। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এক ব্যক্তি। পরে জানা গেল, তিনি এক সময়ের ত্রাস, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। দীর্ঘ সময় জেলে থাকার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। টিটনের এই মৃত্যু ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি পুরনো ক্ষতকেই আবার জাগিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে, পুরনো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কি আবার ফিরছে? তাদের সঙ্গে নতুন আর কারা আসছে? 

হঠাৎ এই অস্থিরতা কেন?

২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগারগুলো থেকে একে একে মুক্তি পেতে শুরু করেন কুখ্যাত সব নাম। এদের মধ্যে আছেন সুইডেন আসলাম, কিলার আব্বাস, সানজিদুল হাসান ইমন ও সুব্রত বাইন।

এদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান সুইডেন আসলাম। ১১ মে মুক্তি পান কিলার আব্বাস এবং ১৫ মে কারাগার থেকে বের হন সানজিদুল হাসান ইমন। অবশ্য এরপর থেকে তাঁরা কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গুঞ্জন আছে তাঁরা দুজনই দেশ ছেড়েছেন। এদিকে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ২০২৫ সালের মে মাসে কুষ্টিয়া থেকে তাঁকে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে।

পুরস্কার ঘোষণা করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের রীতি প্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর ২০০১ সালে ২৩ জনের একটি তালিকা তৈরি হয়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এদের অনেকেই জেলে বসে বা বিদেশ থেকে গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন সরাসরি মাঠে তাঁদের উপস্থিতি বা অনুসারীদের সক্রিয়তা অপরাধ জগতকে অস্থির করে তুলছে।

একজন 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' কীভাবে তৈরি হয়

মনে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই বিশাল সব নামের সন্ত্রাসীরা কি হুট করেই এসেছে? অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হকের মতে, মূলত নব্বইয়ের দশক থেকেই সন্ত্রাসীরা হয়ে ওঠে ক্ষমতার লাঠিয়াল।

এই উত্থানপর্বকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়। যেমন: শুরুতে এরা বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লায় ছোটখাটো অপরাধ করে প্রভাব বিস্তার করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীতে গডফাদার বা রাজনৈতিক কোনো প্রভাবশালী নেতার বলয়ে প্রবেশ করেন। এতে সে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তারা টাকা পায় কোথা থেকে? মূলত চারটি খাত থেকে এসব সন্ত্রাসীর অর্থায়ন হয়—ডিশ ব্যবসা, ফুটপাত দখল, ঝুট ব্যবসা আর মাদক। এই খাতগুলোকেই সন্ত্রাসী তৈরির প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একপর্যায়ে তারা সরাসরি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদ-পদবিতে চলে আসে। এতে তাদের আইনি সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি প্রশাসনিক প্রশ্রয়ের পথও তৈরি হয়।

কিশোর গ্যাং ও ডিজিটাল ক্রাইম

অবশ্য এখন যেহেতু যুগ বদলেছে, তাই সন্ত্রাসী তৈরি হওয়ার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ঢাকার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনারের মতে, দেশে এখন বড় কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী নেই; বরং যারা আছে তারা আগের সন্ত্রাসীদের সহযোগী বা তাদের মতো হতে চায়।

এখনকার সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ উঠে আসছে কিশোর গ্যাং থেকে। এদের অপরাধের ধরন মূলত দুই রকম—ছিনতাই ও বেপরোয়া চাঁদাবাজি। এরা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না এবং এটিই সাধারণ মানুষের জন্য বেশি বিপজ্জনক। আর আগের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিদেশে বসে বা আত্মগোপনে থেকে হোয়াটসঅ্যাপ, বোটম, টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদত হোসেন জানিয়েছেন, পুলিশ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পরিবার ও সমাজ যদি সচেতন না হয়, তবে এই নতুনদের উত্থান ঠেকানো অসম্ভব।

সমাধান কোথায়?

অপরাধ সমাজেরই একটি চিরস্থায়ী অনুষঙ্গ। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে থাকে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফেরা বা নতুনদের উত্থান উভয়ই ইঙ্গিত দেয়, আমাদের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোথাও বড় ফাঁক রয়ে গেছে। টিটনদের মতো পরিণতি এড়াতে এবং নতুনদের এই পথে আসা বন্ধ করতে দরকার সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।