চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই দেখা মিলবে এক অদ্ভুত দুনিয়ার। নাম তার—জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় ৩,১০০ একর বিস্তৃত এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। সরকারি এই খাসজমিতে গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় লাখ মানুষের এক বসতি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এলাকাটিতে প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না! বরং এখানে চলত অপরাধী চক্রের নিজস্ব আইন। এমনকি সাধারণ মানুষের প্রবেশের জন্য ছিল বিশেষ পরিচয়পত্র! এই জঙ্গল সলিমপুর আবারও পুরো দেশের আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু কেন? হঠাৎ কী হলো সেখানে?
যেভাবে আলোচনায় এল
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি বড় কয়েকটি ঘটনা একে 'টক অব দ্য কান্ট্রি'তে পরিণত করেছে। প্রথমটি ঘটে গত ১৯ জানুয়ারি। কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে যায় র্যাব-৭-এর একটি দল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোমাত্রই মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে চার-পাঁচ শ লোক দেশীয় অস্ত্র ও গুলি নিয়ে র্যাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই নৃশংস হামলায় র্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এমন দুঃসাহসিক হামলা পুরো রাষ্ট্রকেই নাড়া দেয়। এরই জবাবে গত ৯ মার্চ সোমবার ভোররাত থেকে জঙ্গল সলিমপুরে আরও বড় আকারে অভিযান শুরু হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ এবং বিজিবির প্রায় চার হাজার সদস্যের এক বিশাল বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। দুর্গম পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা হয় ড্রোন এবং হেলিকপ্টার। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ অভিযানে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭টি পাইপগান, ১ হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলিসহ বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। আটক হয় ২২ জন।
জঙ্গল সলিমপুরে আসলে কী আছে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি আসলে কী? আর কেনই-বা এখানে অভিযান চালানো এতটা কঠিন? ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে, এই এলাকাটি তৈরি হয়েছে অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্গের মতো। এর দুই পাশে উঁচু পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে অত্যন্ত সরু রাস্তা। এই ভৌগোলিক সুবিধার কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলেই হুট করে এখানে ঢুকতে পারত না। নব্বইয়ের দশকে বন বিভাগের এক কর্মচারী আলী আক্কাস এখানে প্রথম বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষ এখানে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বর্তমানে এখানে ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই অসহায় মানুষদের পুঁজি করে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বেশ কয়েকটি ভয়ংকর অপরাধী চক্র। প্রশাসন আগেও বহুবার উচ্ছেদ অভিযান চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সাধারণ অসহায় মানুষদের 'মানবঢাল' হিসেবে সামনে দাঁড় করিয়ে দিত। ফলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসনকে পিছু হটতে হতো। এমনকি নিজেদের সুরক্ষায় পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করত এই অপরাধীরা।
জঙ্গল সলিমপুরের নেপথ্যে কারা?
কিন্তু এই দুর্ভেদ্য দুর্গের নেপথ্যে ছিল কারা? স্থানীয়দের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলেছে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। বিগত ১৭ মাসেই এখানে খুন হয়েছেন ৫ জন! এই যৌথ অভিযানের আগপর্যন্ত এখানে একচ্ছত্র রাজত্ব ছিল ‘ইয়াসিন গ্রুপের’। আর এই ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরাই মূলত র্যাবের ওপর হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এলাকায় সক্রিয় রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোর আয়ের উৎস কী ছিল জানেন? পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট বাণিজ্য, জঙ্গল সলিমপুরের দেড় লাখ মানুষকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং মাদক ব্যবসা। এসব অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমে প্রতি মাসে এখানে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হতো। আর এই বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে অপরাধীরা সব সময়ই কোনো না কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার চেষ্টা করত।
সরকারের পরিকল্পনা কী?
তবে এবার আর পার পায়নি অপরাধীরা। ৯ মার্চের মেগা অভিযানের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। গত রোববার রাতেও যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসী ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সদস্যরা। রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলে থেমে থেমে গোলাগুলি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবার কঠোর অবস্থান নেয়। র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্র কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের চেয়ে দুর্বল নয় এবং এই অভয়ারণ্য সম্পূর্ণ নির্মূল না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ জানিয়েছেন, এখন থেকে জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ ও র্যাবের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প থাকবে এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তার জন্য কামানও মোতায়েন করা হবে।
তাহলে ওই এলাকায় বসবাসকারী দেড় লাখ সাধারণ মানুষের কী হবে? সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান বাসিন্দাদের উচ্ছেদের কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। বরং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা সরকারি প্রকল্প যেমন—কেন্দ্রীয় কারাগারের শাখা, মডেল মসজিদ এবং নভোথিয়েটার নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।
দশকের পর দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুর যে অন্ধকার ও আতঙ্কের রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল, স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেখানে এবার কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে? যৌথ বাহিনী কি পারবে পুরো এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করতে? সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।



