ইরানে ঘন ঘন ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক নাকি গোপন পারমাণবিক পরীক্ষা?

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ইরান। গত কয়েক মাসে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক মাঝারি ও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। আর এই ঘন ঘন ভূকম্পনের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে এক চাঞ্চল্যকর গুঞ্জন। অনেকেই দাবি করছেন, এগুলো আসলে কোনো প্রাকৃতিক ভূমিকম্প নয়; বরং ইরান মাটির নিচে গোপনে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালাচ্ছে, যার ফলে কেঁপে উঠছে চারপাশ! কিন্তু এর সত্যতা কতটুকু? বিজ্ঞান কী বলে? আর আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থাই বা কী জানাচ্ছে? আজকে আমরা জানার চেষ্টা করব ইরানের এই ভূমিকম্প কি প্রাকৃতিক নাকি পারমাণবিক পরীক্ষার ফল।

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান

ইরানে ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় এবং আসল কারণটি লুকিয়ে আছে এর মাটির নিচে, অর্থাৎ ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটের গঠনে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, ইরান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ একটি অঞ্চল। এর কারণ, ইরান মূলত আরব প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের মধ্যে অবস্থিত। ইরানের নিচে থাকা আরব প্লেটটি প্রতি বছর উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিলিমিটার গতিতে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউরেশিয়ান প্লেটকে অনবরত ধাক্কা দিচ্ছে। এই দুই বিশাল প্লেটের প্রচণ্ড চাপের কারণেই তৈরি হয়েছে ইরানের বিখ্যাত জাগরোস পর্বতমালা এবং দেশজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে শত শত ফল্ট লাইন বা ভূত্বকের ফাটল। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং ইরানিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্য বলছে, ইরানের ৯০ শতাংশ এলাকাই সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত। ফলে সেখানে প্রতি বছর ছোট-বড় হাজারো প্রাকৃতিক ভূমিকম্প হওয়াটা ভূতাত্ত্বিক নিয়ম। এটি নতুন কিছু নয়।

ভূমিকম্প নাকি পারমাণবিক পরীক্ষা?

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রাকৃতিক ভূমিকম্প আর মাটির নিচের পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হওয়া কম্পনের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায় কীভাবে? বিজ্ঞানীদের কাছে কি এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে? উত্তর হচ্ছে—হ্যাঁ, আছে। সিসমোগ্রাফ বা ভূকম্পন পরিমাপক যন্ত্রে এই দুটির তরঙ্গ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ধরা পড়ে। প্রাকৃতিক ভূমিকম্প যখন হয়, তখন মাটির নিচে প্লেটের ঘর্ষণের কারণে প্রথমে মৃদু ‘পি’ তরঙ্গ এবং পরে শক্তিশালী ‘এস’ তরঙ্গ তৈরি হয়। সিসমোগ্রাফে এর গ্রাফটি ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে এবং অনেক সময় ধরে কম্পন ছড়ায়। কিন্তু মাটির নিচে কোনো পারমাণবিক বা কৃত্রিম বিস্ফোরণ হলে, এক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচণ্ড শক্তির ‘পি’ তরঙ্গ তৈরি হয় এবং গ্রাফটি হঠাৎ করেই খাড়া ওপরে উঠে যায়। এতে কোনো ধীরগতির ঘর্ষণ থাকে না।

কৃত্রিমভাবে মানুষ মাটির নিচে সর্বোচ্চ কয়েক কিলোমিটার গভীরে সুড়ঙ্গ করতে পারে। তাই পারমাণবিক পরীক্ষার কেন্দ্র হয় ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি—সাধারণত ০ থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে। অন্যদিকে, ইরানের সাম্প্রতিক অধিকাংশ ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল মাটির ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বা তারও গভীরে, যা মানুষের পক্ষে খনন করা অসম্ভব।

পারমাণবিক পরীক্ষা লুকিয়ে রাখা যায়?

বিশ্বের কোথাও কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা হলে তা কি লুকিয়ে রাখা যায়? বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে, যার নাম সংক্ষেপে সিটিবিটিও। সারা পৃথিবীতে তাদের শত শত অত্যন্ত সংবেদনশীল সিসমিক মনিটরিং স্টেশন আছে। মাটির নিচে কোনো বোমার বিস্ফোরণ হলে এই স্টেশনগুলো মুহূর্তের মধ্যে তা ধরে ফেলে। ইরানের সাম্প্রতিক ভূকম্পনগুলোর পর সিটিবিটিও এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পক্ষ থেকে সিসমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছে, ইরানে কোনো ধরনের কৃত্রিম বিস্ফোরণ বা পারমাণবিক পরীক্ষার আলামত পাওয়া যায়নি। এগুলো শতভাগ প্রাকৃতিক সিসমিক অ্যাক্টিভিটি বা টেকটোনিক প্লেটের স্থানচ্যুতির ফল। তা ছাড়া, পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে ভূগর্ভস্থ তেজস্ক্রিয় গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় এবং রেডিয়েশন ডিটেক্টরে ধরা পড়ে। ইরানে এমন কোনো তেজস্ক্রিয়তার প্রমাণ মেলেনি।

কেন এই গুঞ্জন?

বিজ্ঞান যেখানে একে প্রাকৃতিক বলছে, তাহলে কেন পারমাণবিক পরীক্ষার গুঞ্জন ছড়াল? এর পেছনে রয়েছে ভূ-রাজনীতি। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের তীব্র উত্তেজনা চলছে। ইরান বারবার ঘোষণা দিয়েছে তারা পরমাণু প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হচ্ছে। সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বৃদ্ধির পর তা পরিণত হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। আর এ কারণেই ইরানে যখনই কোনো মাঝারি ধরনের কম্পন হয়, তখনই মানুষের মনে সন্দেহ জাগে যে, ইরান হয়তো গোপনে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখল। অর্থাৎ, এই গুঞ্জনটি বৈজ্ঞানিক নয়, বরং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

আসলে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন এক জায়গায়, যেখানে প্রতিনিয়ত টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ চলছে। ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়াটা সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ভূবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর সাথে পারমাণবিক পরীক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।