দীর্ঘ ১০০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আর টালমাটাল অর্থনীতি। অবশেষে কি থামতে চলেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত? কী আছে এই চুক্তির খসড়ায়? কেন এই চুক্তিকে কেউ বলছেন ঐতিহাসিক বিজয়, আবার কেউ বলছেন আত্মসমর্পণ? আজকে আমরা জানব ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার শান্তি চুক্তিতে আসলে কী কী আছে।
কেন এই চুক্তি?
গত কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতি পৌঁছেছে খাদের কিনারায়। বিশেষ করে ইরান যখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তখন থেকেই শুরু হয় চরম উত্তেজনা। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খর্গ দ্বীপ দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই সুর নরম করে তিনি জানান, চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। ইরানের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, দুই পক্ষের চুক্তি এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে কাছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি সই হলে বর্তমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়বে এবং চূড়ান্ত আলোচনার পথও প্রশস্ত হবে।
চুক্তির প্রধান শর্তগুলো
এই চুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো— হরমুজ প্রণালী। ইরান অবিলম্বে এই কৌশলগত জলপথটি সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দিতে রাজি হয়েছে। বিনিময়ে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
ইরানের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর রয়েছে চুক্তির আর্থিক অংশে। প্রথমত, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না। দ্বিতীয়ত, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হবে, যাতে তেহরান তেল বিক্রি করে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। আর তৃতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইরানের আটকে থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হবে। নগদ অর্থ স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে এই বিশাল অর্থ ফেরত পাবে তেহরান।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরমাণু ইস্যু। ট্রাম্প একে বলছেন ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বা পারমাণবিক ধূলিকণা ধ্বংসের চুক্তি। শর্ত অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না, বর্তমানে যে পরমাণু পরিস্থিতি আছে, তা পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ, নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ থাকবে। তবে ইরান একটি জয় পেয়েছে— তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নিতে হবে না, বরং ইরানের ভেতরেই তা পাতলা বা ডিলিউট করা হবে। এই প্রক্রিয়া নিয়ে আগামী ৬০ দিন আলোচনা চলবে।
আঞ্চলিক প্রভাব
এই চুক্তির প্রভাব শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। খসড়ায় লেবাননের যুদ্ধ থামানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তেহরান চায় একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি। তবে ইসরায়েল এই চুক্তিতে বেশ নাখোস। তাদের গণমাধ্যমগুলো বলছে, এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি রাজনৈতিক পরাজয়। ইসরায়েলের ভয়, এই চুক্তির ফলে ইরান এবং লেবাননে তাদের মিত্ররা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আশা করছেন আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই শান্তি চুক্তির ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— ট্রাম্পের মেজাজ আর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মারপ্যাঁচে এই চুক্তি কি শেষ পর্যন্ত টিকবে? এটি কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে নাকি কেবল যুদ্ধের সাময়িক বিরতি? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, চুক্তি আদৌ হবে তো?