সোনা কেবল একটি ধাতু নয়, হাজার বছরের ইতিহাসে এটি সম্পদ, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। দাম বাড়ুক বা কমুক, সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে না। বরং অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ বা অনিশ্চয়তার সময় মানুষ আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে সোনা কেনার দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সোনার দাম কেন কখনো আকাশছোঁয়া হয়, আবার কখনো কমে আসে? আর দাম বাড়লেও কেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সোনা কিনতেই থাকে? আজকে বিষয়টি সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক।
নিরাপদ আশ্রয় সোনা
বিশ্বজুড়ে সোনার দাম নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে মানুষের আস্থা। যখন অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, যুদ্ধ বা বাণিজ্যসংঘাত দেখা দেয়, তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন। সেই নিরাপদ আশ্রয়ের অন্যতম নাম সোনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্যযুদ্ধ, করোনা-পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সোনার চাহিদা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ডলারসহ অন্যান্য সম্পদের তুলনায় সোনার ওপর বেশি আস্থা রাখতে শুরু করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি বড় অংশ সোনায় রূপান্তর করছে। বিশেষ করে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক পরিমাণ সোনা কিনেছে। এর প্রভাবে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সোনার রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে। চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল। তবে ডলারের বিকল্প শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার লক্ষ্যেও তারা সোনার ভান্ডার বাড়াচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নয়, চীনের সাধারণ নাগরিকের মধ্যেও সোনার বার, মুদ্রা ও গয়না কেনার প্রবণতা বেড়েছে।
ভারতীয়দের সোনা কেনার হিড়িক
সোনার বাজারে ভারতের ভূমিকা বিশাল। দেশটিতে বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে সোনার সম্পর্ক গভীর। মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতীয়রা বিয়ে ও উৎসব উপলক্ষে নিয়মিত সোনা কিনে থাকেন। অনেকের কাছে সোনা শুধু অলংকার নয়, বরং দুর্দিনের সঞ্চয়। করোনাকালে বহু পরিবার সোনার গয়না, বার বা কয়েন বিক্রি করে প্রয়োজন মিটিয়েছে। আবার অনেকে সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছেন। ফলে দেশটিতে সোনাকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সোনা কেনায় এগিয়ে এশিয়ানরা
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনা কেনা হয় এশিয়ায়। বিয়ে, জন্মদিন, ধর্মীয় উৎসব, ভবিষ্যতের সঞ্চয় কিংবা সংকটের সময় নিরাপত্তা– সব ক্ষেত্রেই সোনা এখনো মানুষের প্রথম পছন্দগুলোর একটি। চীন-ভারতের মতো এশিয়ার অন্যান্য দেশেও একই চিত্র দেখা যায়। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামেও সোনার চাহিদা বেড়েছে। অনেক দেশে মানুষ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার চেয়ে অল্প অল্প করে সোনা কিনে রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করে। বিশেষ করে যেখানে পেনশনব্যবস্থা দুর্বল বা সীমিত, সেখানে সোনা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
যে কারণে দাম বাড়ে
সোনার দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো, বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনা কেনা যখন বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কিছু স্থিতিশীল বিনিয়োগ খোঁজে, আর সেটাই হলো সোনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডগুলোর আগ্রহ সোনার দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাজারের প্রবণতা, বিভিন্ন সংবাদ ও বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে সোনা বেচাকেনাও এতে প্রভাব ফেলে। মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা থেকে বাঁচতে সোনা একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন ডলারের সঙ্গে সোনার দামের বিপরীত সম্পর্ক দেখা যায়। ডলার দুর্বল হলে অন্য মুদ্রার অধিকারীদের জন্য সোনা কেনা সস্তা হয়, ফলে দাম বাড়ে। বিনিয়োগকারীরা বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির সময় সোনাকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই করোনা অতিমারি-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব রেখেছে।
সোনার দাম কমে কেন?
তবে সব সময় সোনার দাম বাড়ে না। অনেক সময় যুদ্ধ বা সংকট থাকলেও সোনার দাম কমতে পারে। এর অন্যতম কারণ সুদের হার। সোনা এমন একটি সম্পদ, যেখান থেকে কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। ফলে বিনিয়োগকারী লাভ করেন কেবল দাম বাড়লে। অন্যদিকে ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ পাওয়া যায়, বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদ থেকেও আয় হতে পারে। এই কারণে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে অনেক বিনিয়োগকারী সোনা থেকে সরে গিয়ে সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝোঁকেন। ফলে সোনার চাহিদা কমে যায় এবং দামও চাপের মুখে পড়ে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার পর ধারণা তৈরি হয়েছে যে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিবর্তে বাড়াতে পারে। এই আশঙ্কাও সোনার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সোনার দামের সঙ্গে ডলারের সম্পর্কও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ডলারে নির্ধারিত হয়। সাধারণত ডলারের মূল্য শক্তিশালী হলে সোনার দাম কমে এবং ডলার দুর্বল হলে সোনার দাম বাড়ে। কারণ, ডলার শক্তিশালী হলে বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আর ডলার দুর্বল হলে বিকল্প নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ে। এ কারণেই অনেক সময় যুদ্ধ বা অস্থিরতার মধ্যেও সোনার দাম কমে যেতে পারে, যদি একই সময়ে ডলার শক্তিশালী হয়ে ওঠে বা সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়।
সোনার দাম মূলত নির্ভর করে বৈশ্বিক অর্থনীতি, যুদ্ধ-সংঘাত, মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, ডলারের শক্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর। কখনো নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা দাম বাড়িয়ে দেয়, আবার কখনো সুদের হার ও শক্তিশালী ডলার সেই দাম কমিয়ে আনে। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত– শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কাছে সোনা শুধু অলংকার নয়, বরং আস্থা, নিরাপত্তা এবং সম্পদের প্রতীক। তাই দামের ওঠানামা থাকলেও সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনো অটুট।