২০২৬ সালের এখনো মাত্র ২৬টা দিনই গেল, তার মধ্যেই সোনার দাম চড়েছে অভূতপূর্ব উচ্চতায়। প্রতি আউন্সের দাম ছাড়িয়ে গেছে ৫ হাজার ডলারের সীমা!
রুপার দামে উত্থান ছিল আরও বেশি চোখে পড়ার মতো। আউন্সপ্রতি দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে! ফলে সোনা–রুপার অনুপাত নেমে এসেছে ২০১১ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে।
সোনার দাম বাড়তে থাকার পেছনে অনেক কারণই আছে। ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, এর পেছনে একসঙ্গে কাজ করছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কাঠামোগত পরিবর্তন। একদিকে বিশ্বের বড় মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের দাম পড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো খুব দ্রুতগতিতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোনায় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা — বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে পরিস্থিতি এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা — নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজারে আরেকটি বড় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন। দেশটির ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কমতে পারে বলে অনুমান। ফিউচার্স মার্কেটের অনুমান, ২০২৬ সালের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার মোট ১.৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। সুদের হার কমলে সোনার দাম বাড়ে কেন, সোনায় তো আর কোনো সুদ নেই? সুদের নিচু হারকে যখন মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে ফেললে অনেক ক্ষেত্রে ‘নেগেটিভ রিটার্ন’ই আসে, তার চেয়ে কোনো সুদ না দেওয়া – কিন্তু যেকোনো সময়ে নিরাপদ – সোনাই ভালো! বাড়ে সোনার চাহিদা।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় ব্যাংক সোনার দামের পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। কেউ কেউ এখন প্রকাশ্যেই বলছে — আগামী এক বছরের মধ্যে সোনা ৬,০০০ ডলার ছুঁতে পারে।
সোনার দাম নিয়ে হইহুল্লোড় তো অনেকদিন ধরেই চলছে, এর মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রুপার দাম হঠাৎ করে লাফাতে শুরু করা। সোনার মতো শুধু বিনিয়োগ চাহিদা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদনে ব্যাপক ব্যবহার রুপার চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মূল্যবান ধাতুটির বাজার বদলে যাচ্ছে ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে।
শিল্প চাহিদায় রুপার ‘বিস্ফোরণ’
ইকোনমিক টাইমস লিখেছে, রুপার দাম বৃদ্ধিটা আরও নাটকীয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় দাম তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। এর পেছনে আছে বিনিয়োগে চাহিদা এবং সরবরাহ সংকট দুটিই।
রুপার প্রায় ৬০ শতাংশ চাহিদা আসে শিল্প খাত থেকে, আর এই অংশ দ্রুত বাড়ছে। এআই ডেটা সেন্টার, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুৎ গ্রিড ও শক্তি সঞ্চয় প্রকল্প — সবখানেই রুপার ব্যবহার বাড়ছে।
অন্যদিকে সরবরাহ বাড়ছে না। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ রুপা আসে অন্য ধাতুর উপপণ্য বা বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে। ফলে দাম বাড়লেও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়। এতে বড় বড় ভল্টে রুপার মজুত কমছে, দাম আরও চড়ছে। সোনা–রুপার অনুপাত নেমে এসেছে প্রায় ৪৬:১–এ।
সোনা–রুপার অনুপাত আগে কত ছিল?
এক বছর আগেও এক আউন্স সোনা দিয়ে ১২০ আউন্সের বেশি রুপা কেনা যেত। এখন সেই অনুপাত অর্ধেকেরও কম। ইতিহাস বলছে, শিল্প সম্প্রসারণ ও মুদ্রানীতির অনিশ্চয়তা একসঙ্গে হতে থাকলেই এমন দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এই ধারা চললে ২০১১ সালের মতো ৩২:১ অনুপাতেও নামতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিনিয়োগকারীদের জন্য এর মানে পরিষ্কার—
সোনা মূলত ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে একরকম সুরক্ষা। আর রুপা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, এটি এখন সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
রুপা কি ১২৫ ডলার ছাড়াবে?
রুপার দাম ১২৫ ডলার ছাড়ানো এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনা। ২০২৬ সালে রুপা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো পারফরম করা বড় সম্পদ। ১১০ ডলারকে অনেকেই এখন সর্বোচ্চ পর্যায় নয়, বরং ভিত হিসেবে দেখছেন।
কারণ এবার রূপার দামে উত্থান কোনো জল্পনা-কল্পনা থেকে নয়, বরং চাহিদার সঙ্গে জোগানের বাস্তব ঘাটতির ফল। টানা আট বছর ধরে বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতি চলছে। এর ওপর ১ জানুয়ারি থেকে চীন নতুন রপ্তানি লাইসেন্স নীতি চালু করায় বিশ্ববাজারে রুপার প্রবাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।
হিসাব নিকাশও রুপার দাম বাড়তে থাকার পক্ষে বলছে। সোনার দাম যদি ৫,০০০ ডলারের কাছাকাছি থাকে এবং সোনা–রুপার অনুপাত ৪০:১–এ নামে, তাহলে রুপার দাম দাঁড়ায় ১২৫ ডলার। শিল্প খাতের চাপ ও বিনিয়োগ প্রবাহ চলতে থাকলে ১২৫–১৫০ ডলারের রেঞ্জকে আর ব্যতিক্রমী মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।


সোনার দাম আর কত বাড়তে পারে?
