ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, পাকিস্তান ফের ভাঙছে?

১৯৭১–এর পর ২০২৬ সালে এসে আবারও কি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে একটি চিঠি। দাবি করা হচ্ছে, ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ বা স্বাধীন বেলুচিস্তানের পক্ষ থেকে এই চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। আরও বড় দাবি—বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামীরা নাকি ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে! কিন্তু আসলেই কি তা-ই? পাকিস্তান কি সত্যিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হারাল? আর একটা চিঠি প্রকাশ করলেই কি একটা নতুন দেশ তৈরি হয়ে যায়? আমাদের আজকের আলোচনায় এ বিষয়গুলোই জানার চেষ্টা করা হবে।

বেলুচিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা

ঘটনার শুরু একটা চিঠি দিয়ে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, বেলুচিস্তান এখন আর পাকিস্তানের অংশ নয়, তারা স্বাধীন। তবে আন্তর্জাতিক কোনো নিরপেক্ষ সংস্থা এখনো এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাস্তব সত্য হলো, পাকিস্তান এখনো এই অঞ্চলের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই দাবি পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে।

আচ্ছা, ধরুন একটা গোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করল, কিন্তু আসলেই কি তারা একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দেশ হয়ে যেতে পারবে? উত্তর হলো—না! একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা পেতে হলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ৪টি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। ১৯৩৩ সালের মন্টভিডিও কনভেনশন অনুযায়ী এই শর্তগুলো কী, চলুন একদম সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক:

স্থায়ী জনসংখ্যা: একটা দেশের জন্য নির্দিষ্ট মানুষ লাগবে, যারা সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে। বেলুচিস্তানের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জাতিগত পরিচয় আছে। তাই জনসংখ্যার শর্ত তারা পূরণ করে। তবে প্রশ্ন হলো, সেখানে থাকা অন্য সংখ্যালঘুদের অধিকার তারা কীভাবে রক্ষা করবে?

নির্দিষ্ট সীমানা: একটি দেশের সীমান্ত বা সীমানা কোনটি, সেটা স্পষ্ট হতে হবে। আর এখানেই বেলুচিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ঐতিহাসিক বেলুচ অঞ্চল শুধু পাকিস্তানেই নয়, ইরান এবং আফগানিস্তানের মধ্যেও ছড়িয়ে আছে। তাই সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধ বা বিরোধ অবধারিত।

কার্যকরী সরকার: শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই হয় না; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, হাসপাতাল-স্কুল চালানো এবং কর আদায়ের মতো একটি শক্তিশালী সরকারও থাকতে হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য এই সরকার চালানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা: অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করা, রাষ্ট্রদূত পাঠানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার ক্ষমতা একটি স্বাধীন দেশের থাকতে হবে।

সবচেয়ে বড় বাধা জাতিসংঘের স্বীকৃতি

ধরে নিলাম বেলুচিস্তান এই ৪টি শর্তই পূরণ করল। কিন্তু তারপরও তারা দেশ হতে পারবে না, যদি না আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি পায়। আন্তর্জাতিক আইনে দুটি তত্ত্ব আছে। এক দল বলে, শর্ত পূরণ করলেই দেশ। আরেক দল বলে, অন্য দেশগুলো স্বীকৃতি না দিলে আপনি কিছুই না! বাস্তবে, স্বীকৃতি ছাড়া আপনি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিতে পারবেন না, আপনার দেশের পাসপোর্ট কেউ গ্রহণ করবে না, এমনকি বৈশ্বিক ব্যাংকিং সিস্টেমও আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না। আর এর চূড়ান্ত ধাপ হলো জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়া, যা মোটেও সহজ নয়। এর জন্য দুটি ধাপ পার হতে হয়:

 সিকিউরিটি কাউন্সিলের সবুজ সংকেত: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্যদেশের মধ্যে অন্তত ৯টি দেশের ভোট পেতে হবে। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো ‘পি-ফাইভ’ (P5) অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—এই ৫টি স্থায়ী দেশের কোনো একটি যদি ভেটো বা আপত্তি দেয়, তবে খেলা ওখানেই শেষ!

 সাধারণ পরিষদের ভোট: সিকিউরিটি কাউন্সিলের বাধা পার হতে পারলে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ দেশের ভোট পেতে হবে সদস্যপদের জন্য।

বেলুচিস্তানের জন্য কেন এটি ‘মিশন ইম্পসিবল’?

এবার আসা যাক আসল ভূরাজনীতিতে। বেলুচিস্তানের জন্য স্বাধীন দেশ হওয়া কেন প্রায় অসম্ভব? প্রথমত, পাকিস্তান কোনোভাবেই তাদের ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ ছেড়ে দেবে না। আর দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশী ইরান এবং আফগানিস্তানও এতে বাধা দেবে, কারণ তাদের দেশেও বেলুচ জনসংখ্যা রয়েছে।

আর সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় কে জানেন? চীন! চীনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সিপিসি (CPEC) প্রজেক্ট এবং বিখ্যাত গাওদার বন্দর এই বেলুচিস্তানেই অবস্থিত। চীন তার এত বড় বিনিয়োগ বাঁচাতে যেকোনো মূল্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে বেলুচিস্তানের স্বীকৃতি আটকে দেবে। বিশ্ব পরাশক্তিগুলোও এই অঞ্চলে নতুন কোনো যুদ্ধ বা অশান্তি চায় না।

দক্ষিণ সুদান বনাম তাইওয়ান

ইতিহাস আমাদের কী শেখায়? ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান কিন্তু সুদানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ঠিকই স্বাধীন দেশ হতে পেরেছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্যপদও পেয়েছিল। অন্যদিকে তাইওয়ানের দিকে তাকান; তাদের নিজস্ব শক্তিশালী সরকার আছে, সেনাবাহিনী আছে, অর্থনীতি আছে, তাও কিন্তু ভূরাজনীতির কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

তাই বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার এই তথাকথিত চিঠি বা ৮৫ শতাংশ এলাকা দখলের দাবি কেবল একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের শুরু মাত্র। আন্তর্জাতিক সমর্থন আর পরাশক্তিদের সবুজ সংকেত ছাড়া স্বাধীন দেশ হওয়া কেবলই দুরূহ স্বপ্ন।