গত জানুয়ারিতেই বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। দেশে প্রতি ভরি সোনার দাম প্রায় ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি চলে যায়। মানুষের মনে তখন প্রশ্ন ওঠে, সোনা কেনা কি তবে এবার সাধ্যের বাইরে চলে গেল? কিন্তু চমকের পর চমক দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সোনার বাজারে চলছে এই নিম্নমুখী ধারা (প্রবণতা)। এখন প্রশ্ন হলো— মধ্যবিত্তের জন্য কি তবে সোনা কেনার সুবর্ণ সুযোগ এল? দাম কি আরও কমবে, নাকি এক ধাপে বাড়বে বহুগুণ? আজকে আমরা সেই বিষয়টিই বোঝার চেষ্টা করব।
সোনার বর্তমান বাজারদর
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক বাজুসের নির্ধারিত একদম নতুন দামটা ঠিক কত। বর্তমানে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। ২১ ক্যারেট প্রতি ভরি ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা। ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা। ৩ লাখ টাকার তুলনায় ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা শুনলে মনে হয় অনেকটা কমেছে, তাই না? সত্যিটা আসলে কী? দাম কি আসলেই আরও কমবে?
কেন কমছে সোনার দাম?
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে রেকর্ড ওঠানামার পর প্রায় ৯১ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। যার মধ্যে ৪৪ বার বেড়েছে আর ৪৬ বার কমেছে। কিন্তু হঠাৎ এই নিম্নগতির রহস্য কী? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে ৩টি বড় বৈশ্বিক কারণ।
১. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেলের বাজারের চাপ: গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার এক বিশাল চাপে পড়ে। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম হুহু করে বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির ওপর এর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
২. মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে স্বর্ণের দামের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার। নিয়মটা খুব সহজ— সুদের হার বাড়লে মানুষের কাছে মার্কিন ডলার আর ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বেড়ে যায়। কারণ, সোনা কিনে ঘরে রেখে দিলে তো আর মাস শেষে সুদ পাওয়া যায় না! তাই বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ডলারে কেনা হয় বলে ডলারের দাম বাড়লে সোনা এমনিতেই ব্যয়বহুল হয়ে যায়, ফলে বিশ্ববাজারে এর চাহিদাও কমে যায়। আর চাহিদা কমলে দাম তো কমবেই!
৩. চীনা ব্যাংকের মহাচাল: বাজুসের প্রাইসিং কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বিবিসি বাংলাকে একটি দারুণ পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। চীনা ব্যাংকগুলো সম্প্রতি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা আর পেপার ট্রেডিং গোল্ড বা ডিজিটাল সোনার মালিকানা রাখতে দেবে না। আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে সবাইকে এগুলো এনক্যাশ বা টাকায় রূপান্তর করতে হবে। একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সোনা বাজারে বিক্রির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একটা বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে, যার কারণে দাম নিচের দিকে নামছে।
দাম কি আবারও বাড়বে?
তাহলে কি এই দাম কমতেই থাকবে? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ যদি আরও তীব্র আকার ধারণ করে, তবে বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়বে। আর ঝুঁকি বাড়লে মানুষ আবার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সোনা কেনা শুরু করবে। তাই এই দাম কমাটা খুব একটা স্থায়ী নাও হতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে যারা স্বর্ণের দামের পূর্বাভাস দেয়, সেই বিশ্বখ্যাত ওয়েবসাইটগুলোর প্রেডিকশন শুনলে আপনি চমকে উঠবেন! তাদের মতে, এই ২০২৬ সালের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স ৫৮০০ থেকে ৬০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে! বাজুসের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিম্নমুখী প্রবণতার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। বিনিয়োগকারীরা যখন আবার সোনা কেনা শুরু করবেন, দাম তখন রকেটের গতিতে ওপরে উঠবে!
সোনা কি আসলেই সেরা বিনিয়োগ?
বাংলাদেশে সোনা শুধু গহনা নয়, এটি একটি নিরাপদ সম্পদ। সোনা থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা ডিভিডেন্ড না আসলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখে এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে নিরাপদ ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাহলে চূড়ান্ত কথা কী? আপনি যদি ব্যক্তিগত বা পরিবারের জন্য গহনা কিনতে চান, তবে দামের এই চলতি নিম্নমুখী ধারা বা কমতির সুযোগটা নিতে পারেন। তবে কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে শুধু সোনাতেই বড় বিনিয়োগ করতে চান, তবে অবশ্যই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিদিনের ওঠানামার দিকে কড়া নজর রেখে তবেই নামবেন।



