৪০০ বছর ধরে যে তাজমহলকে গোটা পৃথিবী চিনেছে প্রেমের প্রতীক হিসেবে, সেই তাজমহলকে নিয়ে ইদানীং এত বিতর্ক কেন উঠছে? সুপ্রিম কোর্ট যেখানে এই দাবি খারিজ করে দিয়েছেন, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগও অবস্থান স্পষ্ট করেছে, তবুও কেন বারবার এই কথা সামনে আনা হচ্ছে যে তাজমহল আসলে একটি শিবমন্দির? আজ আমরা তাজমহলকে নিয়ে এই রাজনীতির ভেতরের আসল কারণটা খোলামেলা আলোচনা করব।
ইতিহাসের রাজনৈতিকীকরণ
তাজমহলকে নিয়ে বারবার বিতর্কের প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো—ইতিহাসের রাজনৈতিকীকরণ। বর্তমানে ভারতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। এই বয়ানের মূল উদ্দেশ্য হলো—সাধারণ মানুষের মনে এটা গেঁথে দেওয়া যে মুসলিম শাসনকাল মানেই ছিল শুধুই হিন্দুদের ওপর অত্যাচার, মন্দির ধ্বংস আর দাসত্ব। আর এই ক্ষোভকে উসকে দেওয়ার জন্য তাজমহলের চেয়ে বড় প্রতীক আর কী হতে পারে? কারণ তাজমহল হলো ভারতের মুসলিম স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় গৌরব। তাই এই গৌরবকে যদি কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, যদি প্রমাণ করা যায় যে এটাও আসলে একটি মন্দির, তাহলে সেই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ হয়ে যায়। এটা আসলে ইতিহাস খোঁজা নয়, এটা হলো বর্তমানের রাজনীতি দিয়ে অতীতকে বদলানোর চেষ্টা।
পিএন ওক সিন্ড্রোম
কিন্তু এই আজগুবি তত্ত্ব সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে কেন? কারণ এর পেছনে আছে এক সুনির্দিষ্ট প্রপাগান্ডা, যার জনক ছিলেন পুরুষোত্তম নাগেশ ওক বা পিএন ওক। ১৯৬৫ এবং ১৯৮৯ সালে তিনি দুটো বই লিখে দাবি করেন তাজমহল আসলে শিবমন্দির ছিল। যদিও ইতিহাসবিদেরা তাঁর দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং ২০০০ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন। এরপরও কিন্তু তাঁর সেই কাল্পনিক গল্পগুলো মরেনি। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই পিএন ওকের প্রপাগান্ডাকে নতুন করে বোতলজাত করে ছড়ানো হচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের ফোনে মেসেজ যাচ্ছে—"জানেন কি, তাজমহলের নিচে শিবলিঙ্গ আছে?" সাধারণ মানুষ, যারা ইতিহাস পড়ে না, শুধু ফেসবুক- হোয়াটসঅ্যাপের ট্রল দেখে প্রভাবিত হয়, তারা খুব সহজেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। আর এই অন্ধ আবেগকে পুঁজি করেই অমরনাথ মিশ্রের মতো বিজেপি নেতারা বারবার আদালতে পিটিশন দাখিল করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছেন।
২২টি বন্ধ কক্ষের রহস্য
বারবার যে একটি জিগির তোলা হয়—"তাজমহলের নিচের ২২টি কক্ষ কেন বন্ধ? ওগুলো খুলে দেওয়া হোক!" এটা কেন করা হয় জানেন? যাতে সাধারণ মানুষের মনে একটি রহস্য বা সন্দেহের দানা বাঁধে। বলা হয়, ওখানে নিশ্চয়ই দেব-দেবীর মূর্তি লুকিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে কোনো ধর্মীয় কারণে নয়, বৈজ্ঞানিক কারণে। তাজমহল নদীতীরে অবস্থিত। ওই বেসমেন্টের কক্ষগুলো যদি সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় খোলা রাখা হয়, তবে মানুষের নিঃশ্বাস এবং বাইরের জলীয় বাষ্পের কারণে ভেতরের দেয়াল এবং তাজমহলের মূল মার্বেল পাথরের ভিত্তি ধসে পড়তে পারে। স্থাপনাটির স্থায়িত্ব রক্ষার জন্যই ওগুলো বন্ধ। কিন্তু প্রপাগান্ডাকারীরা এই বৈজ্ঞানিক সত্যটা চেপে গিয়ে ওটাকে একটি ধর্মীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করে, যাতে বিতর্কটা কখনোই শেষ না হয়।
আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতা প্রদর্শন
তাজমহলকে নিয়ে বারবার বিতর্ক হওয়ার আরেকটি বিপজ্জনক কারণ হলো বিদ্যমান আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো। ভারতের সংবিধানে ‘প্লেস অব ওরশিপ অ্যাক্ট, ১৯৯১’ নামের একটি আইন আছে, যা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে সুরক্ষা দেয়। এই আইনে পরিষ্কার বলা আছে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার সময় যে ধর্মীয় উপাসনালয় যেভাবে ছিল, সেটার চরিত্র কখনো বদলানো যাবে না। কিন্তু ইদানীং জ্ঞানবাপী মসজিদ, সম্ভলের মসজিদ কিংবা ধর শহরের ভোজশালা মন্দিরের মতো একের পর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে এই আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তাজমহলকে এই তালিকায় যুক্ত করার চেষ্টা মূলত আইনকে চ্যালেঞ্জ করা এবং একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতাদর্শের ক্ষমতা প্রদর্শন করার একটি খেলা।
তাজমহল কি শুধুই পাথর?
রাজনীতি আসবে, রাজনীতি যাবে। সরকার বদলাবে, ভোটের সমীকরণও পাল্টাবে। কিন্তু সাদা মার্বেলের এই তাজমহল গত ৪০০ বছর ধরে যেভাবে ভারতের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেভাবেই থাকবে। যারা শব্দ নিয়ে খেলে বা হোয়াটসঅ্যাপে প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে বিশ্বদরবারে ভারতের এই শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকে খাটো করতে চায়, তারা আসলে ভারতের সংস্কৃতিকেই ধ্বংস করছে। তাজমহল কোনো মন্দির ভাঙার ইতিহাস নয়, তাজমহল হলো নিখাদ শিল্পের ইতিহাস, ভালোবাসার ইতিহাস। আর ভালোবাসার এই প্রতীককে কোনো সস্তা রাজনৈতিক এজেন্ডা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যাবে না।