দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর এই মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই তিনি পদত্যাগ করেছেন দলের মহাসচিব এবং একই সাথে সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর পদ থেকে। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মির্জা ফখরুল যদি রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনে যান, তাহলে রাজপথ আর নয়াপল্টনের এই বিশাল রাজনৈতিক দলের হাল ধরবেন কে? কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব? দলের ভেতরে আর বাইরে এখন এই নিয়ে চলছে তুমুল জল্পনা-কল্পনা।
তিনটি পদ শূন্য
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে একই সাথে দল ও সরকারের তিনটি বড় পদ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয়ত, বিএনপির মহাসচিব পদ। এবং তৃতীয়ত, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য পদ।
এখানেই শেষ নয়, বিএনপির নীতি-নির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটিতেও তৈরি হচ্ছে বড় শূন্যতা। আগে অব. মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হওয়ার পর একটি পদ খালি হয়েছিল। এখন মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করায় স্থায়ী কমিটিতে এখন দুটি পদ পুরোপুরি ফাঁকা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকার ও দলের এই শূন্য স্থানগুলো পূরণ করবেন কারা?
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রিজভী?
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, এই মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের জায়গায় কাউকে বসানো হচ্ছে না। মির্জা ফখরুল নিজেও ২০১১ সালে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান, যা ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এবারও সেই পথেই হাঁটছে দল। মির্জা ফখরুলের স্থানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে যার নাম সবচেয়ে জোরেশোরে আসছে, তিনি আর কেউ নন—দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুল দুজনেই অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। এই কঠিন সময়েও নয়াপল্টনে নিয়মিত বসে দল পরিচালনা করা, সারা দেশের নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখের কথা শোনার কাজটা এক হাতে সামলেছেন রুহুল কবির রিজভী। ফলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে তাঁর ওপরই আস্থা রাখছে হাইকমান্ড।
স্থায়ী মহাসচিব হচ্ছেন কে?
তবে ভারপ্রাপ্ত তো সাময়িক সমাধান। পরবর্তী কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে কার নাম আসবে? দৌড়ে নাম রয়েছে কয়েকজন শক্ত হেভিওয়েট নেতার। তালিকার শীর্ষে যাদের নাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তাদের একজন হলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম শীর্ষ ও সিনিয়র এই নেতাকে মহাসচিব পদের শক্ত দাবিদার মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সালাহউদ্দিন ও রুহুল কবির রিজভীর বাইরেও আলোচনায় আছেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। রাজপথের ত্যাগী এবং জনপ্রিয় নেতা হিসেবে তৃণমূলের একটা বড় অংশে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
এর পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির শূন্য দুটি পদে আসতে পারেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু কিংবা জয়নুল আবদীন ফারুকের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা। তবে দিনশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তিনিই নির্ধারণ করবেন বিএনপির ভবিষ্যৎ অভিভাবক কে হচ্ছেন।
এবার আসা যাক দল ছেড়ে সরকার ও সংসদীয় আসনের সমীকরণে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে আনা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। আবার বিএনপির একাংশ মনে করছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন করে পূর্ণ মন্ত্রী দেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। সেখানে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমই হয়তো পুরোদমে দায়িত্ব পালন করবেন।
আর মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ ফাঁকা হলে সেখানে উপনির্বাচনে কাকে মনোনয়ন দেবে বিএনপি? দলীয় সূত্র বলছে, এখানে মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনকেই হয়তো ধানের শীষের প্রার্থী করা হবে।
আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গভবনের মসনদে বসছেন—এটা এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার। তবে রাজপথের সবচেয়ে বড় শক্তি বিএনপিকে আগামী দিনে কে নেতৃত্ব দেবেন, কার হাত ধরে আসবে পরবর্তী সাংগঠনিক গতিশীলতা—তার পুরোটাই নির্ভর করছে তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।