বৃহস্পতিবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মানেই যে জনগণের সরাসরি ভোট—তা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে বেশ বৈচিত্র্য আছে। কোথাও সাধারণ ভোটার সরাসরি ভোট দেন, আবার কোথাও সংসদ সদস্য ও প্রাদেশিক জনপ্রতিনিধিরা মিলে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করেন। চলুন দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে কীভাবে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশ: সংসদ সদস্যদের ভোট
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার ৩৫ বছর পর সংসদে ভোট গ্রহণ হতে যাচ্ছে। তবে দেশের সাধারণ ভোটাররা নয়, ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বাইরের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন না। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেন।
ভারত: নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোট
ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন একটি বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে। এতে লোকসভা ও রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্য এবং রাজ্য ও নির্দিষ্ট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা ভোট দেন। তবে এখানে সবার ভোটের মূল্য সমান নয়। জনসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বিধায়কদের ভোটের মূল্য নির্ধারিত হয়। ভোট হয় পছন্দক্রমভিত্তিক, অর্থাৎ একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট (সিঙ্গেল ট্রান্সফারেবল ভোট) পদ্ধতিতে।
পাকিস্তান: সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের ভোট
পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিও সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সিনেট, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি এবং চারটি প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির সদস্যরা মিলে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করেন। প্রাদেশিক পরিষদগুলোর সদস্যসংখ্যা এক নয়। তাই ভোটের মূল্য এমনভাবে সমন্বয় করা হয়, যাতে চার প্রদেশের প্রতিনিধিত্বে ভারসাম্য থাকে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় গোপন ব্যালটে। ভোট গণনার পর যে প্রার্থী নির্ধারিত নির্বাচনী পদ্ধতিতে সর্বাধিক বা প্রয়োজনীয় ভোট পান, তিনিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
নেপাল: কেন্দ্র ও প্রদেশের জনপ্রতিনিধি
নেপালের ফেডারেল পার্লামেন্ট ও প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির সদস্যদের নিয়ে গঠিত নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এখানেও সব ভোটের মূল্য সমান নয়। ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্য ও প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলির সদস্যদের ভোটের মূল্য আলাদা। প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পরবর্তী দফায় ভোট হতে পারে।
শ্রীলঙ্কা: সরাসরি জনগণের ভোট
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার পদ্ধতিটি একেবারেই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি পেলে তিনিই বিজয়ী হন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা শুধু প্রথম পছন্দ নয়, প্রয়োজনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দও চিহ্নিত করতে পারেন। প্রথম গণনায় কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে নির্দিষ্ট নিয়মে পরবর্তী পছন্দের ভোট বিবেচনায় নিয়ে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।
শ্রীলঙ্কার ভোটাররা ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নামের সামনের খালি ঘরে ‘১’ নম্বর লিখে পছন্দ চিহ্নিত করেন। একাধিক পছন্দ থাকলে সেই অনুযায়ী অন্যান্য প্রার্থীর নামের সামনে ‘২’, ‘৩’ ইত্যাদি লেখা যায়। আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী যদি অর্ধেকের বেশি ভোট না পান, তবে এই অগ্রাধিকার ভোটের ওপর নির্ভর করেই বিজয়ী নির্ধারিত হয়।
মিয়ানমার: তিন পক্ষের নির্বাচকমণ্ডলী
মিয়ানমারে সাধারণ ভোটার সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন না। দেশটির সাংবিধানিক ব্যবস্থায় পার্লামেন্টের তিনটি পক্ষ—নিম্নকক্ষ, উচ্চকক্ষ এবং সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিরা—একজন করে প্রার্থী মনোনয়ন দেন।
এরপর তিন প্রার্থীর মধ্যে ভোট গ্রহণ হয়। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হন এবং অন্য দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। পার্লামেন্টে সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত আসন থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পার্থক্য কোথায়?
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মিয়ানমারে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন না। তবে নির্বাচকমণ্ডলীর গঠন একেক দেশে একেক রকম। কোথাও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বিধায়কেরা ভোট দেন, কোথাও ভোটের মূল্য ভিন্ন, আবার মিয়ানমারে রয়েছে সামরিক প্রতিনিধিত্ব।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সরাসরি জনগণের ভোটে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে, তা মূলত নির্ভর করে প্রতিটি দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর।