দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ফের অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। সবশেষ ১৯৯১ সালে কীভাবে হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট? এবারই বা ভোট হবে কোন প্রক্রিয়ায়? সবচেয়ে বড় কথা—দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে প্রকাশ্যে ভোট দিলে কী হবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
১৯৯১ সালের সেই উত্তপ্ত ভোট
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম এবং শেষ নির্বাচন, যেখানে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ব্যালট বাক্সে সরাসরি ভোট পড়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর কেটে গেছে। একক প্রার্থী থাকায় আটবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। এরপর বাংলাদেশ ফের ফিরে যায় সংসদীয় গণতন্ত্রে। রাষ্ট্রপতিকে এমপিদের ভোটে নির্বাচিত করতে তৈরি হয় নতুন আইন। ৮ অক্টোবর ১৯৯১, জাতীয় সংসদ কক্ষে বসেছিল সেই ঐতিহাসিক ভোটের আসর।
লড়াইয়ে ছিলেন দুজন প্রার্থী। বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। দুপুর ঠিক ২টা ৩ মিনিটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভোটদানের মাধ্যমে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। কিন্তু ভোট শুরু হতেই বাঁধে হট্টগোল। মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিমসহ আওয়ামী লীগের এমপিরা কক্ষে ঢুকে স্পিকারের জায়গায় সিইসিকে দেখে 'শেইম শেইম' বলে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের মূল ক্ষোভ ছিল—রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেন গোপন ব্যালটের বদলে প্রকাশ্যে স্বাক্ষর দিয়ে ভোট দিতে হবে?
তবে সব বিতর্ক পেরিয়ে বিকেল ৫টায় ফল আসে। ৩৩০ জন ভোটারের মধ্যে ২৬৪ জন ভোট দেন। এর মধ্যে ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস। আর আওয়ামী লীগের বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ফের কেন ভোট?
১৯৯১ সালের সেই ভোটের পর গত ৩৫ বছরে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিল না। ফলে ক্ষমতাসীন দল যাকে মনোনয়ন দিত, তিনিই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হতেন। কিন্তু এবার মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বদলে যায় সমীকরণ। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করার পর এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিরোধী দল। জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রার্থী করা হয়েছে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি প্রার্থী করেছে দলটির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। যেহেতু প্রার্থী একাধিক, তাই আইন অনুযায়ী এবারও ব্যালট বাক্সে গড়াচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এবার যেভাবে হবে ভোটগ্রহণ
তাহলে আগামী বৃহস্পতিবার কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে এই নির্বাচন? নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন পুরো প্রক্রিয়া। তিনি জানান, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষেই চলবে ভোটগ্রহণ। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনেই বসে থাকবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ২০ জন কর্মকর্তা তাঁদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন। প্রতিটি ব্যালট পেপারে এমপিদের প্রার্থীর নামের পাশে নিজেদের পূর্ণ স্বাক্ষর ও বিভক্তি সংখ্যা লিখতে হবে এবং বাক্সে ফেলতে হবে। এবার ভোট দেওয়ার দৃশ্য ছাড়াও ব্যালট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার করা হবে।
এই নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন, যার মধ্যে ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য।
সামনে আসছে বড় বিতর্ক
এবার আসা যাক সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নটিতে—প্রকাশ্যে ভোট হওয়ায় কোনো এমপি যদি নিজের দলের প্রার্থীর বিপক্ষে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেন, তবে কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে? সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় সংসদ সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও মনে করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। কেউ যদি দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেন, তবে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল ঘোষণা করবে।
তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে—৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে সংসদে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব বা আইন প্রণয়নে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে পদ যাবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন বা স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীর অংশ নয়; এটি সংবিধান ও বিশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন দ্বারা পরিচালিত। তাই এখানে দলের বাইরে ভোট দিলেও এমপি পদ বাতিল হওয়ার আইনি সুযোগ নেই।
জাতীয় সংসদে বিএনপির সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলীয় হিসাব-নিকাশে তাঁদের প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত। তবুও দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদীয় কক্ষে এই প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার দৃশ্য দেখাটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে।



