আমেরিকায় পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখা হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবারের জন্য এলো বছরের সবচেয়ে স্বস্তির খবর। বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপানো বিতর্কিত অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করে বাতিল করেছে ম্যানহাটন ফেডারেল আদালত। কিন্তু কথা হলো, এই রায়ের ফলে বাংলাদেশিরা কীভাবে সরাসরি লাভবান হবেন? স্থগিত থাকা পারিবারিক ভিসা, ক্যাটাগরিভিত্তিক রিভিউ এবং ঢাকা দূতাবাসের ভিসা জট নিয়ে কী ঘটতে যাচ্ছে? চলুন বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করা যাক।
আটকে থাকা ভিসা সচল
এই রায়ে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় লাভ হলো, পারিবারিক পুনর্মিলন বা ফ্যামিলি ভিসার দ্বার উন্মোচিত হওয়া। আমেরিকায় বসবাসকারী যেসব বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক তাদের পরিবার—যেমন বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোনকে ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশের পর থেকে তাদের ফাইলগুলো পুরোপুরি ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। যেহেতু সেই আদেশ এখন আর বলবৎ থাকছে না, তাই এই ভিসাগুলোর প্রক্রিয়া ফের শুরু হবে।
অর্থাৎ, জানুয়ারি থেকে যে হাজার হাজার ফাইল আটকে রাখা হয়েছিল, আদালতের এই নির্দেশের পর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস আইনগতভাবে সেগুলো স্থগিত রাখতে পারবে না। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার প্রসেসিং আটকে থাকায় যে মানসিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তারও অবসান ঘটছে।
ব্যক্তিগত যোগ্যতার মূল্যায়ন
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে গেলে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিচারক জ্যানেট ভার্গাস রায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, কনস্যুলার অফিসারদের কাছে যে ক্ষমতা ছিল, তা কেড়ে নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে কেবল জাতীয়তা দেখে ভিসা বন্ধ করেছিলেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এর ফলে বাংলাদেশিদের যে দ্বিতীয় লাভটি হচ্ছে তা হলো ব্যক্তিগত মেধার মূল্যায়ন। এখন থেকে আর কেবল বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণে কাউকেই অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না। প্রতিটি আবেদনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিক্ষা ও স্পন্সরের আর্থিক সামর্থ্য দেখে স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যাখ্যান হওয়া ফাইল ওপেন হওয়ার পথও খুলবে। গত জানুয়ারি থেকে কেবল এই নীতির অজুহাতে যাদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, আদালতের আদেশে সেগুলোর রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কনস্যুলেটে গতি বাড়বে
তিন নম্বর লাভ হলো—ঢাকা মার্কিন কনস্যুলেটে জমে থাকা ব্যাকলগ কমবে এবং ইন্টারভিউ ডেট দ্রুত মিলবে। জানুয়ারি থেকে যখন ওপরের আদেশে ঢালাও ভিসা স্থগিত রাখা হয়েছিল, তখন কনস্যুলার অফিসারদের হাত বাঁধা ছিল। ফলে ইন্টারভিউ স্লট ও প্রসেসিং টাইম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বিচারক ভার্গাস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বাতিল করে কনস্যুলার অফিসারদের স্বাধীন বিচারিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এতে ঢাকা দূতাবাস এখন নতুন করে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইন্টারভিউ সেশন শুরু করতে পারবে। শুধু ফ্যামিলি ভিসা নয়, এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় আমেরিকায় যেতে চাওয়া বাংলাদেশি ডাক্তার, প্রকৌশলী ও গবেষকদের ঝুলে থাকা আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির আলো দেখবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই রায়ের মাধ্যমে মার্কিন সমাজে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সম্মান ও আইনি সুরক্ষা পুনর্বহাল হলো।
ট্রাম্প প্রশাসন যে ঢালাওভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশ কিংবা সরকারি সহায়তার বোঝা হিসেবে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের চিহ্নিত করেছিল, মার্কিন আদালতের রায়ে সেই নীতিকে বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক প্রমাণিত করা হলো। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেকোনো আমেরিকান প্রশাসনের হুটহাট অসংবিধানিক বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বড় ধরনের আইনি বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে—আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ে বাংলাদেশিদের ঝুলন্ত ইমিগ্র্যান্ট ভিসা সচল হচ্ছে, ঢাকা কনস্যুলেটের গতি বাড়ছে এবং অহেতুক ঢালাও প্রত্যাখ্যানের ভয় কাটছে।