বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবলেই যে দেশের নাম সবার আগে মাথায় আসে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন এক ঘোষণায় এখন রীতিমতো কাঁপন ধরেছে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া লাখো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর বুকে! বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য কি সেখানে থাকার পথ কঠিন হয়ে যাচ্ছে? পিএইচডি বা মাস্টার্স করতে গিয়ে মাঝপথেই কি পাট চুকিয়ে ফিরতে হবে? আজ আমরা সহজ ভাষায় জানব ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এই স্টুডেন্ট ভিসানীতির ভেতরের গল্প।
কী কী বদলাচ্ছে?
মোটা দাগে মার্কিন স্টুডেন্ট ভিসায় ৫ থেকে ৬টি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। চলুন একদম সহজ ভাষায় পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
প্রথম পরিবর্তন (ভিসার মেয়াদ কমছে): আগে যেখানে ৫ বছরের ভিসা দেওয়া হতো, এখন তা কমিয়ে করা হচ্ছে ৪ বছর।
দ্বিতীয় পরিবর্তন ('ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস' সীমিত): আগে নিয়ম ছিল, কোর্স শেষ করতে যত বছরই লাগুক না কেন—শিক্ষার্থী বৈধ হিসেবে গণ্য হতেন। কিন্তু এখন ৪ বছর পার হলেই ভিসার মেয়াদ শেষ!
তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় ধাক্কা (ক্ষমতার বদল): আগে কারও পড়াশোনা শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লাগলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা—যাকে বলা হয় ডেজিগনেটেড স্কুল অফিশিয়াল—তিনিই কাগজপত্র দেখে সময় বাড়িয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে! এখন সময় বাড়াতে হলে সরাসরি আবেদন করতে হবে মার্কিন ফেডারেল সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনে থাকা ইউএসসিআইএসের (USCIS) কাছে। অর্থাৎ, সরকারের সবুজ সংকেত ছাড়া এক দিনও বেশি থাকা যাবে না!
চতুর্থ পরিবর্তন (গ্রেস পিরিয়ড অর্ধেক): পড়াশোনা শেষ করে দেশ ছাড়ার জন্য আগে যেখানে ৬০ দিন বা ২ মাস সময় পাওয়া যেত, এখন তা কমিয়ে করা হয়েছে মাত্র ৩০ দিন।
সবচেয়ে বেশি বিপদে কারা?
এখন প্রশ্ন হলো, এই নিয়মে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় কারা পড়বেন? আমেরিকায় ব্যাচেলর বা স্নাতক কোর্সগুলো সাধারণত ৪ বছরের হয়। কিন্তু যারা মাস্টার্স, পিএইচডি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য যান, তাঁদের সময় অনেক বেশি লাগে। কাগজে-কলমে পিএইচডি ৫ বছর বলা হলেও ল্যাব টেস্ট, থিসিস পাবলিশ বা ফান্ডিংয়ের ঝামেলার কারণে বাস্তব জীবনে তা শেষ করতে অনেকেরই ৬ থেকে ৭ বছর লেগে যায়। যেহেতু এখন চার বছর পর সময় বাড়ানোর (এক্সটেনশন) জন্য সরাসরি মার্কিন সরকারের দরজায় কড়া নাড়তে হবে, তাই আবেদন করলেই যে সময় বাড়ানো হবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই! ফলে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। এমনকি যারা এখন ৫ বছরের ভিসা নিয়ে আমেরিকায় আছেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাঁদেরও এই নতুন সিস্টেমে চলে আসতে হবে।
ভয় পাওয়ার কারণ আছে কি?
তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এই মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। মার্কিন ইমিগ্রেশন আইনজীবী রাজু মহাজনের মতে, যারা প্রকৃত শিক্ষার্থী এবং নিয়ম মেনে ঠিকঠাক পড়াশোনা করছেন, তাঁদের ভিসা এক্সটেনশন পেতে কোনো সমস্যাই হবে না। আমেরিকা মূলত এই কঠোর নিয়মটি এনেছে ভিসার অপব্যবহার বন্ধ করতে। অনেকেই স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে পড়াশোনা না করে পূর্ণকালীন অন্য কাজে জড়িয়ে পড়েন, কিংবা শুধু বৈধ স্ট্যাটাস ধরে রাখার জন্য একের পর এক কলেজ বা কোর্স পরিবর্তন করতে থাকেন। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য আসলে তাঁরাই। আপনি যদি সায়েন্টিফিক বা রেগুলার কোর্সের জেনুইন স্টুডেন্ট হন, শিক্ষক যদি সুপারিশপত্র (রিকমেন্ডেশন লেটার) দেন—তবে কেন্দ্রীয় সরকারও আপনার এক্সটেনশন আটকে দেবে না। তা ছাড়া, মাস্টার্স শেষ করে কেউ যদি পিএইচডিতে ভর্তি হতে চান—তাহলে তাঁর নতুন স্ট্যাটাস তৈরি হবে, তাই সেখানেও বড় কোনো বাধা আসবে না।
ট্রাম্প আসলে কী চাচ্ছেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগে কি কোপ পড়ছে? না, এর মূল নিয়মে কোনো বদল আসেনি। স্টেম (STEM) অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষার্থীরা আগের মতোই ৩ বছর এবং নন-স্টেম বিষয়ের শিক্ষার্থীরা ১ বছর কাজের সুযোগ পাবেন। তবে হ্যাঁ, পড়াশোনা শেষের ৩০ দিনের গ্রেস পিরিয়ডের নিয়মটি মাথায় রাখতে হবে।
তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ এত কঠোর কেন হচ্ছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচন। রিপাবলিকান পার্টি বর্তমানে অভিবাসন, মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভোটারদের আবেগ নিজেদের পক্ষে টানতে চাইছে। আর ভোটারদের খুশি করতেই একের পর এক এই কড়া ঘোষণা। তবে সুখের খবর হলো, গত দুই বছরে আমেরিকার এমন অনেক অভিবাসন নীতিই শেষ পর্যন্ত আদালতে গিয়ে টিকতে পারেনি, বাতিল হয়ে গেছে।
একনজরে দেখতে গেলে, ট্রাম্পের এই নতুন নীতি অবশ্যই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটু বাড়তি মানসিক চাপ এবং কাগজপত্রের বাড়তি ঝামেলা তৈরি করবে। তবে যারা সততার সঙ্গে শুধু পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আমেরিকা যাচ্ছেন বা যাবেন ভাবছেন, তাঁদের স্বপ্ন ভেস্তে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। নিয়ম মেনে চললে আমেরিকার দরজা আপনার জন্য খোলাই থাকছে।



