অবৈধ লোন অ্যাপের ব্ল্যাকমেইল ফাঁদ

জরুরি প্রয়োজনে কোনো জামানত ছাড়াই বিভিন্ন অ্যাপে মাত্র পাঁচ মিনিটে পাওয়া যাচ্ছে ঋণ। শুনতে তো দারুণ লাগছে, তাই না? কিন্তু আপনি কি জানেন, এই অ্যাপগুলোর আড়ালে কাজ করছে এক ভয়ংকর ব্ল্যাকমেইল চক্র? বাংলাদেশে এই লোন অ্যাপের ধারণা নতুন হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে ইতিমধ্যে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। কিন্তু অবৈধ এই লোন অ্যাপগুলো কীভাবে গোপনে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে? এই চক্রের হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিতই বা রাখবেন কীভাবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

যেভাবে হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি

দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অন্তত ৩০টি অনুমোদনহীন ও অবৈধ অ্যাপ এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ অ্যাপ আপনার ফোনে ইনস্টল হওয়ার পর কীভাবে এই ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি করে? আসুন এই পুরো কৌশলটি ধাপে ধাপে বুঝে নেওয়া যাক।

লোভনীয় বিজ্ঞাপন: ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রলোভন দিয়ে বিজ্ঞাপন চালানো হয়।

অনুমতির নামে তথ্য চুরি: অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ বা নগদের মতো এমএফএস নম্বর চায়। তবে আসল ফাঁদটি পাতা হয় অ্যাপ পারমিশনের জায়গায়। অ্যাপটি চালু করতেই ফোনের গ্যালারি, ক্যামেরা, কনট্যাক্ট লিস্ট ও এসএমএস ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়। এই পারমিশন না দিলে ঋণ মেলে না।

চক্রবৃদ্ধি সুদের চাপ: অ্যাকাউন্টে টাকা আসার পরপরই শুরু হয় মূল খেলা। সপ্তাহে সপ্তাহে অস্বাভাবিক হারে সুদ বসানো হয়। ২৪ হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সুদে-আসলে ৮১ হাজার টাকা দাবি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

ডিজিটাল হেনস্তা: যখনই প্রদেয় অর্থ পরিশোধে আপত্তি জানানো হয়, তখন অ্যাপটি ইনস্টল করার সময় চুরি করা কনট্যাক্ট লিস্ট ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের ফোন দিয়ে মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

৩০টি অবৈধ অ্যাপ

বাংলাদেশে সক্রিয় পাওয়া গেছে এমন ৩০টি অবৈধ অ্যাপের তালিকায় রয়েছে—সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, অনলাইন লোন বিডিসহ আরও বেশ কিছু নাম। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে দেশের নিবন্ধিত ও সুপরিচিত ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার নামও কৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কেমন?

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে এই চক্রটি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, তা ভারতের চিত্র দেখলেই স্পষ্ট হয়। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দেশে মাত্র দুই হাজার রুপি ঋণ নিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে এক তরুণ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সেখানে ব্ল্যাকমেইলের মাত্রা এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭১৮টি অবৈধ লোন অ্যাপ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসূত্র

আইনগতভাবে বাংলাদেশে ডিজিটাল বা যেকোনো মাধ্যমে ঋণদানের ক্ষমতা কেবল অনুমোদিত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। বর্তমানে বিকাশ, ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক বা সিটি ব্যাংকের মতো নির্দিষ্ট কিছু নিবন্ধিত অ্যাপেই বৈধভাবে অ্যাপভিত্তিক ঋণ নেওয়া সম্ভব। এর বাইরে কোনো ব্যক্তি বা অজ্ঞাত প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ দিয়ে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত ও নিষিদ্ধ।

এদের পরিচালনাকারী কারা?

তদন্তে দেখা গেছে, এই অ্যাপগুলোর কোনো নির্দিষ্ট কার্যালয় বা দৃশ্যমান ঠিকানা নেই। মার্কিন বিচার বিভাগ ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে অনলাইন সাইবার অপরাধীদের প্রধান আখড়া। তারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে এবং বছরে শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়।

প্রতিরোধের উপায়

বাংলাদেশে এই চক্রটি যেন বিশাল আকার ধারণ করতে না পারে, সেজন্য আমাদের নিজেদেরই কিছু সাধারণ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

অ্যাপ পারমিশন চেক করুন: যেকোনো অ্যাপ নামানোর সময় সেটি যদি আপনার ‘কনট্যাক্ট’ বা ‘ফটোস’ অ্যাক্সেস চায়—তখনই থামুন। একটি লোন অ্যাপের কখনোই আপনার ব্যক্তিগত ছবির গ্যালারির প্রয়োজন হতে পারে না।

প্রতিষ্ঠানের নাম যাচাই: ঋণ নেওয়ার আগে সেই অ্যাপটি বাংলাদেশ ব্যাংক বা এমআরএ কর্তৃক স্বীকৃত কি না, তা ভালোভাবে দেখে নিন।

বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার ‘ইনস্ট্যান্ট লোন’ বিজ্ঞাপনে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন।

যদি ইতিমধ্যে কেউ এই অ্যাপগুলোর ফাঁদে পড়ে থাকেন, তবে ভয় পেয়ে ব্ল্যাকমেইলারদের টাকা দেওয়া বন্ধ করুন। অবিলম্বে নিকটস্থ থানা, ডিবির সাইবার অপরাধ বিভাগ অথবা সিআইডির সাইবার হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে আইনি সহায়তা নিন।

ডিজিটাল যুগে সচেতনতাই হলো আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। একটি অসাবধান ভুল ক্লিক আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।