পাকিস্তানের আকাশ থেকে ভারতের রাফালকে টক্কর দেওয়া সেই বহুল আলোচিত যুদ্ধবিমান এবার কি উড়বে বাংলাদেশের আকাশে? ঠিকই শুনেছেন। তথ্য উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান জানিয়েছেন, চীন থেকে ৪.৫ জেনারেশনের অত্যাধুনিক জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চলছে। আগামী বছরই হয়ত শুরু হবে ক্রয় প্রক্রিয়া।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে এই যুদ্ধবিমানটি ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমানের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে? আর এটা যুক্ত হলে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা শক্তিশালী হবে?
জে-১০সিই কেন কিনছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষায় পুরনো এফ-৭, মিগ-২৯ এবং ইয়াক-১৩০ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই এবার তাঁদের বহরে যুক্ত হচ্ছে ৪.৫ জেনারেশনের জে-১০ সিই। এটি চীনের বিখ্যাত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের অফিসিয়াল এক্সপোর্ট ভার্সন। ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ২২০ কোটি ডলারে ২০টি ফাইটার জেট, স্পেয়ার পার্টস, পরিবহন ও পাইলটদের ট্রেনিং নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ। এটি একাধারে আকাশে প্রতিপক্ষের বিমান ধ্বংস করতে পারে, আবার মাটিতে থাকা শত্রুঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালাতে পারে- যাকে বলা হয় মাল্টিরোল সক্ষমতা!
কতটা ভয়ংকর এর প্রযুক্তি?
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। কেন এই জে-১০সিই-কে এত ভয়ংকর বলা হয়? প্রথমত, এর শিকার করার সক্ষমতার কারণে। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক এএসইএ রাডার। এই রাডার শত শত কিলোমিটার দূরে থাকা একাধিক শত্রুকে একসাথে সনাক্ত করতে পারে এবং নিজের অবস্থান গোপন রাখে।
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এর মারণাস্ত্র- পিএল-১৫ মিসাইল। বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ বা চোখের সীমানার বাইরে আঘাত হানার ক্ষেত্রে এই মিসাইলের কোনো জুড়ি নেই। মিসাইলের ভেতরে থাকা নিজস্ব রাডার পাইলটের সাহায্য ছাড়াই শত্রুবিমানকে লক করে একদম ধ্বংস করে দেয়। এর সুপারস্পিড এভিয়েনিক্স সুইট হলো বিমানের মস্তিষ্ক, যা শত্রুপক্ষ কী ভাবছে বা কখন মিসাইল ছুড়ছে, তা কয়েক মিলিসেকেন্ডে পাইলটকে জানিয়ে দেয়।
রাফাল বনাম জে-১০সিই
সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত আকাশযুদ্ধে আলোচনার আসে এই জে-১০সিই। পাকিস্তান দাবি করে, তারা চীনের দেওয়া জে-১০সিই দিয়ে ভারতের ফরাসি প্রযুক্তির বিখ্যাত রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তাহলে কি জে-১০সিই কি রাফালের চেয়ে সেরা? চলুন দেখে নেওয়া যাক:
প্রথমেই ইঞ্জিন ও বহন ক্ষমতা। রাফাল দুই ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমান, তাই এটি জে-১০সিই-এর চেয়ে বেশি অস্ত্র ও তেল বহন করতে পারে, প্রায় সাড়ে ২৪ টন। অন্যদিকে জে-১০সিই এক ইঞ্জিনের হওয়ায় এর দাম অনেক কম, কিন্তু গতি ও ক্ষিপ্রতায় এটি কোনো অংশে কম নয়।
এবারে চোখ রাখা যাক অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধে। রাফালের স্পেকট্রা ওয়ারফেয়ার সিস্টেম শক্তিশালী হলেও, জে-১০সিইর পিএল-১৫ মিসাইল দূরপাল্লার লড়াইয়ে রাফালকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়। এক কথায়, খোলা আকাশে সঠিক কৌশলে রাফাল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, দূর থেকে পিএল-১৫ মিসাইল ছুড়ে যেকোনো রাফালকে খোদ আকাশেই উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে জে-১০সিই।
কেন জে-১০সিই গেমচেঞ্জার?
এবারে আসা যাক দামের প্রসঙ্গে। একটি ফরাসি রাফাল কিনতে যেখানে খরচ হয় ২০০ থেকে ২২০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে চীন নির্মিত একটি জে-১০সিই-এর দাম মাত্র ৪০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, ১টি রাফালের দামে কেনা সম্ভব ৩ থেকে ৪টি জে-১০সিই।
এশিয়ান অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে শর্ট ও মিডিয়াম রেঞ্জের যেকোনো যুদ্ধ সামলাতে জে-১০সিই’র চেয়ে শক্তিশালী ও বাজেট-ফ্রেন্ডলি বিকল্প এই মুহূর্তে দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাদেশে এটি যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক আকাশসীমায় প্রতিরক্ষা ভারসাম্য অনেকাংশেই বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকবে।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি
বিমানবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি ইতোমধ্যেই চীনের প্রতিনিধিদের সাথে দরকষাকষি, চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ, মেইনটেন্যান্স ও পাইলটদের ট্রেনিংয়ের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। গত বছর প্রকাশিত কয়েকটি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিমান কেনার অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, অর্থনীতির ওপর বড় কোনো চাপ না ফেলে বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী এক এয়ারফোর্স বহর।