সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বমঞ্চে শক্তির সমীকরণই বদলে দিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মিলে করেছে এক ঐতিহাসিক চুক্তি, যার নাম ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘মক্কা প্যাক্ট’। কিন্তু গল্পটা শুধু এই তিন দেশেই থেমে নেই। বাংলাদেশ থেকেও ঘোষণা এসেছে—জাতীয় স্বার্থ মিলে গেলে এই জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত ঢাকাও। কিন্তু কী এই মক্কা প্যাক্ট? এতে বাংলাদেশ যোগ দিলে কী কী লাভ বা ঝুঁকি রয়েছে? আর ঢাকা-ইসলামাবাদ-আঙ্কারা-রিয়াদ অক্ষ তৈরি হওয়া নিয়ে প্রতিবেশী ভারতেরই বা কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
মক্কা প্যাক্ট কী, সামরিক ক্ষমতাই বা কতটা?
সহজ কথায় বললে, মক্কা প্যাক্ট হলো ন্যাটোর মতো একটি যৌথ সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর মূল ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট—তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে, তা বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এই তিন দেশ মিলে ঠিক কতটা শক্তিশালী সামরিক ব্লক তৈরি করেছে, তা গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্যে স্পষ্ট।
তিন দেশের সম্মিলিত নিয়মিত সেনা সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে পাকিস্তানের আছে ৬ লাখ ৬০ হাজার, তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের আছে ২ লাখ ৪৭ হাজার সেনা। তিন দেশ মিলিয়ে আছে প্রায় ৩ হাজার ৪১৫টি সামরিক বিমান ও ফাইটার জেট। স্থলবাহিনীর ব্যবহারের জন্য আছে ৬ হাজার ৪৬টি ভারী ট্যাংক এবং ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান। সম্মিলিত তিন নৌবাহিনীর আছে ৩৪৪টি যুদ্ধজাহাজ, যার মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট ও ২২টি সাবমেরিন।
এই তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেট বছরে প্রায় ১২৪.৪ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিন দেশ একে অপরের অভাব পূরণ করছে। সৌদি আরব দিচ্ছে অফুরন্ত অর্থ ও বৈশ্বিক প্রভাব; তুরস্ক দিচ্ছে বায়রাক্তার ড্রোন, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ন্যাটো-মানের প্রযুক্তি; আর পাকিস্তান দিচ্ছে দক্ষ জনবল, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের ওপর আস্থা হারিয়ে এই দেশগুলো এখন নিজেদের রক্ষা করতে নিজেদের অক্ষ বা হরিজন্টাল কানেক্টিভিটি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ কেন এতে যোগ দিতে চায়?
ঠিক এই জায়গায় প্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশের। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাফ জানিয়েছেন, বদলে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—বাংলাদেশ কেন হুট করে এমন এক সামরিক বা আঞ্চলিক জোটে আগ্রহ দেখাচ্ছে? এতে আমাদের লাভ কী?
১. কৌশলগত বিকল্প বৃদ্ধি: এতদিন বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর ভূরাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল। এই ধরনের সামরিক বা অর্থনৈতিক ব্লকে যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কৌশলগত দরকষাকষির ক্ষমতা বহু গুণ বেড়ে যাবে।
২. অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সুবিধা: সৌদি আরবের আর্থিক বাজার, তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য ও সংযোগ (কানেক্টিভিটি) বাড়লে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি দুই-ই শক্তিশালী হবে।
৩. চীনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য: বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ও ‘টু প্লাস টু’ অংশীদারিত্ব ইতিমধ্যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মক্কা প্যাক্টের মতো নতুন অক্ষের সঙ্গে যুক্ত থাকা ঢাকাকে এশিয়ায় একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করবে।
ভারতের এত মাথাব্যথা কেন?
এবার আসা যাক সবচেয়ে জটিল জায়গায়—এই পুরো সমীকরণে দিল্লির কেন এত চিন্তার কারণ তৈরি হচ্ছে?
প্রথমত, পাকিস্তান ফ্যাক্টর। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তান যখন সৌদি ও তুরস্কের মতো দুই শক্তিশালী দেশকে সঙ্গে নিয়ে আঞ্চলিক জোট গঠন করে, তাতেই দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। এখন তার ওপর যদি ভারতের একদম ঘরের পাশে থাকা বাংলাদেশও এই বলয়ে যুক্ত হয়, তবে তা দিল্লির ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে ঢাকা স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট জানিয়েছেন—ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে রাজনৈতিক সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া এবং দিল্লির মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরও বাস্তবসম্মত নয়।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস। দীর্ঘদিনের দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাবের নীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন বেইজিং, ইসলামাবাদ, আঙ্কারা ও রিয়াদ—সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় একক প্রভাব ধরে রাখা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া—সবখানেই এক নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মক্কা প্যাক্ট কেবল তিনটি দেশের চুক্তি নয়, এটি সুপারপাওয়ারগুলোর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর এক বড় প্রয়াস। আর বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত এই অক্ষ বা প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নকশা চিরতরে বদলে যেতে পারে।


মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ নজরদারিতে রাখছে দিল্লি: জয়সওয়াল
