সাধারণত নদী-নালার পানি বাড়ে ধীরে ধীরে। দিন কিংবা সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়, মানুষ নিরাপদে সরে যাওয়ার সময় পায়। কিন্তু একবার চিন্তা করুন তো, মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী হঠাৎ উথলে উঠে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়া, চোখের পলকে তছনছ করে দিচ্ছে সেতু, ঘরবাড়ি আর মানুষ।
সম্প্রতি নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ঘটেছে এর চেয়েও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আধা ঘন্টারও কম সময়ে নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যায় ২০ মিটার পর্যন্ত। এতে এখন পর্যন্ত ৫শ'র বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ আছেন দেড় হাজার মানুষ।
প্রকৃতির এই ভয়ংকর রূপকেই আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা বলেন 'ফ্ল্যাশ ফ্লাড' বা আকস্মিক বন্যা। কিন্তু এটি কেন হয়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বন্যার পূর্বাভাস কি আগে থেকে পাওয়া সম্ভব? চলুন বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক।
ফ্ল্যাশ ফ্লাড আসলে কী?
ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা হলো হঠাৎ ও অপ্রতিরোধ্য পানির তীব্র স্রোত। এটি সাধারণত পাহাড়ি উপত্যকা, সংকীর্ণ খাদ কিংবা নিচু এলাকায় খুব দ্রুত আছড়ে পড়ে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ও আবহাওয়াবিদদের মতে, এই বন্যা তৈরি হতে সময় নেয় খুব কম, মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিই এর জন্য যথেষ্ট। এটি ক্ষণস্থায়ী হলেও এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা কল্পনার অতীত। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই আকস্মিক বন্যায় প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যান, যার বেশিরভাগই ঘটে পানিতে ডুবে। এর পানির প্রবল স্রোত পুরো একটি এলাকার অবকাঠামো মূলসুদ্ধ উপড়ে ফেলতে পারে।
ফ্ল্যাশ ফ্লাডের মূল কারণ
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এত দ্রুত এই পানি জমে? এর পেছনে প্রধান কারণ অতিবৃষ্টি। তবে কেবল বৃষ্টিই নয়, পাহাড়ের খাড়া ঢাল, কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে যাওয়া কিংবা ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যও অনেক সময় এর জন্য দায়ী। পাহাড়ি এলাকার শক্ত মাটি বা পাথর পানি শোষণ করতে পারে না। ফলে ভারী বৃষ্টি হলে সব পানি গড়িয়ে এক জায়গায় জমে পানির একটি 'দেয়াল' তৈরি করে।
কিন্তু সম্প্রতি নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে যা ঘটল, তা আরও ভয়ংকর। গবেষকরা বলছেন, লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহ ধসে পড়েছিল। এই ধসের ধাক্কা এতটাই তীব্র ছিল যে, আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এর ফলে ভূগর্ভে ৫.২ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হয়। এই হিমবাহ ধসে বরফ ও পাথর নদীর পানি আটকে দেয় এবং পরবর্তীতে সেই বাঁধ ভেঙে তৈরি হওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড সবকিছু তছনছ করে দেয়।
এছাড়া, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাতাসে জলীয়বাষ্প ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে অতিবৃষ্টির প্রবণতা ও হিমবাহ গলে যাওয়ার ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পূর্বাভাস কি পাওয়া সম্ভব?
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। সাধারণ বন্যার মতো আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রেও কি পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব? উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ, সম্ভব। কিন্তু এখানে মূল চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে 'সময়' বা 'লিড টাইম'। অর্থাৎ, সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকে, কিন্তু হঠাৎ হওয়া ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির সময় পাওয়া যায় অত্যন্ত কম।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সিদ্ধান্ত (ডব্লিউএমও) অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার আগের সতর্কবার্তাকে একটি নির্ভরযোগ্য সময় ধরা হয়। বড় নদীগুলোর তথ্য সহজে পাওয়া গেলেও ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয় দূরবর্তী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে পর্যাপ্ত আবহাওয়া বা হাইড্রোলজিক্যাল স্টেশন থাকে না।
বর্তমানে প্রযুক্তির সহায়তায় স্যাটেলাইট, অটোমেটিক সেন্সর এবং হিমবাহ হ্রদে আধুনিক মনিটরিং ডিভাইস বসিয়ে হ্রদের পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী বা হিমবাহ যদি আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে, এই যেমন তিব্বত থেকে নেপাল বা ভারত হয়ে বাংলাদেশে, সেক্ষেত্রে এক দেশের সাথে অন্য দেশের রিয়েল-টাইম ডেটা বা তথ্যের আদান-প্রদান আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিরোধের উপায় ও করণীয়
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপকে হয়তো আমরা পুরো থামিয়ে দিতে পারব না, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দুটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। প্রথমত, আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং। সীমান্তঘেঁষা দুর্গম এলাকাগুলোতে স্যাটেলাইট সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং দুই দেশের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতি নিয়ন্ত্রণ। পাহাড়ি খাড়া ঢাল ও নদীর একদম তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসতি স্থাপন বন্ধ করা এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রকৃতির এই আকস্মিক বিপদগুলো বিশ্বব্যাপী নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। এছাড়া ফ্ল্যাশ ফ্লাডের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের জীবন রক্ষার্থে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সতর্কতার।