একজন মানুষকে মেরে ফেলার জন্য প্রোপোফলের যতটুকু মাত্রা যথেষ্ট, তার চেয়েও বেশি মাত্রার কড়া ওষুধ প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছিল মাইকেল জ্যাকসনকে! অথচ চারপাশের কেউ তার কিছুই টের পায়নি! পপ সংগীতের এই একচ্ছত্র সম্রাটের আকস্মিক বিদায় পুরো পৃথিবীকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু কীভাবে এক অতি সাধারণ ঘরের ছেলে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে নিজের নাম 'কিং অব পপ' হিসেবে খোদাই করে নিলেন? আর কীভাবেই বা তার সেই সোনালী সাম্রাজ্য শেষ হলো এক অন্ধকার ও রহস্যময় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে? আজ আমরা জানব পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের সংগ্রাম, রূপকথার মতো উত্থান এবং সেই মর্মান্তিক ও রহস্যময় বিদায়ের পিছনের আসল সত্য।
দুই কামরার ঘর থেকে 'দ্য জ্যাকসন ফাইভ'
১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট, আমেরিকার ইন্ডিয়ানার গ্যারি শহরে জন্ম নেন মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। জোসেফ ও ক্যাথরিন জ্যাকসন দম্পতির নয় সন্তানের মধ্যে মাইকেল ছিলেন সপ্তম। একটি ছোট দুই কামরার ঘরে বেড়ে ওঠা এই সাধারণ পরিবারটির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল সংগীতের এক অবিশ্বাস্য কারখানা। বাবা জোসেফ ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। সন্তানদের গান ও নাচে দক্ষ করে তুলতে তিনি বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ভাইদের সাথে নিয়ে গড়া দল "দ্য জ্যাকসন ফাইভ"-এ যোগ দেন মাইকেল। আর খুব অল্প বয়সেই তার অসাধারণ কণ্ঠ ও নাচের নিজস্ব ভঙ্গি সবার নজর কেড়ে নেয়। ১৯৬৯ সালে বিখ্যাত 'মোটাউন রেকর্ডস'-এর সাথে চুক্তি হওয়ার পর রাতারাতি তারকা বনে যান কিশোর মাইকেল।
'থ্রিলার', মুনওয়াক ও বিশ্বজয়
তবে আসল ইতিহাস সৃষ্টি হয় ১৯৭৯ সালে, যখন একক শিল্পী হিসেবে প্রকাশিত হয় তার অ্যালবাম "অফ দ্য ওয়াল"। এর ঠিক পরপরই, ১৯৮২ সালে আসে বিশ্ব সংগীতের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অ্যালবাম—"থ্রিলার"। যা আজও বিশ্বের সর্বকালের সর্বোচ্চ বিক্রিত অ্যালবামের রেকর্ড ধরে রেখেছে। "থ্রিলার", "বিট ইট", "বিলি জিন"-এর মতো গান আর তার সিগনেচার "মুনওয়াক" ডান্স মাইকেলকে বসিয়ে দেয় সংগীত ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসনে। আশির ও নব্বইয়ের দশক জুড়ে মাইকেল ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী তারকা। একদিকে ঝুড়ি ঝুড়ি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড আর অন্যদিকে তার ত্বকের রঙ বদল—যা পরবর্তীতে 'ভিটিলিগো' নামক চর্মরোগের কারণে হয়েছিল বলে জানা যায়। নিজস্ব চিড়িয়াখানা ও থিম পার্ক নিয়ে গড়া তার সুবিশাল 'নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চ' হয়ে ওঠে তার রঙিন অথচ রহস্যময় জীবনের প্রতীক।
২০০৯ সালের ২৫ জুন—থমকে যাওয়া বিশ্ব
২০০৯ সালের ২৫ জুন। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক বিলাসবহুল বাড়িতে নিথর হয়ে পড়ে রইলেন পপ সংগীতের এই বাদশাহ। বয়স হয়েছিল মাত্র ৫০ বছর। কয়েক সপ্তাহ পরেই লন্ডনে শুরু হওয়ার কথা ছিল তার ঐতিহাসিক কামব্যাক কনসার্ট সিরিজ "দিস ইজ ইট"। চোখের পলকে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল সব টিকিট, বিশ্বজুড়ে লাখো ভক্ত প্রহর গুনছিলেন রাজার সেই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন দেখার জন্য। কিন্তু আলো ঝলমলে মঞ্চে ওঠার আগেই চিরতরে নিভে গেল সেই জীবন। মৃত্যুর তদন্তে নেমে পুলিশ আবিষ্কার করে এক ভয়ংকর সত্য! তার মৃত্যুর মূল কারণ ছিল 'প্রোপোফল' নামের একটি অত্যন্ত কড়া অ্যানেস্থেটিক।
সাধারণত হাসপাতালে সার্জারির সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণে এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অথচ এই বিপজ্জনক ওষুধটি কোনো ধরনের মেডিক্যাল মনিটরিং ছাড়াই তাকে নিজ বাড়িতে নিয়মিত দিতেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডক্টর কনরাড মারে!
কনরাড মারে, অনিদ্রা ও আদালতের রায়
কিন্তু কেন দেওয়া হতো এই বিপজ্জনক ড্রাগ? মূলত দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক অনিদ্রা রোগে ভুগছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। সামনে কনসার্টের অমানবিক চাপ—সব মিলিয়ে ঘুম যেন তার চোখ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছিল। আর সেই ঘুম আনতেই ডাক্তার মারে নিয়মিত প্রোপোফল দিতে শুরু করেন, যা ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রের স্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন! ঘটনার দিন সকালেও ওষুধ প্রয়োগের পর মারে কিছুক্ষণের জন্য রুমের বাইরে যান। কিন্তু ফিরে এসে যা দেখেন, তা ছিল এক বিভীষিকা—মাইকেলের শ্বাস-প্রশ্বাস ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে!
তদন্তের পর ২০১১ সালে বসে বিচার। আদালতে ডক্টর মারের চরম অবহেলা ও গাফিলতি প্রমাণিত হয় এবং তিনি "ইনভলান্টারি ম্যানস্লটার" অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়।
কনসপিরেসি থিওরি
তবে এই রায়েও শান্ত হয়নি ভক্তদের মন। মাইকেলের মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় একের পর এক কনসপিরেসি থিওরি। কেউ দাবি করেন—এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কেউ আবার অদ্ভুত দাবি তোলেন যে, মাইকেল আসলে মারা যাননি, রূপ বদলে কোথাও লুকিয়ে আছেন! আবার কনসার্ট প্রমোটার ও রেকর্ড লেবেলগুলোর দিকেও আঙুল তোলেন অনেকে, কারণ মৃত্যুর পর মাইকেলের সম্পত্তি ও অ্যালবাম বিক্রি থেকে আয় বেড়ে যায় বহুগুণ।
যদিও এসব তত্ত্বের সপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু পপ সম্রাটের বিদায়কে ঘিরে আলোচনার পারদ নামেনি একটুও। মাইকেল জ্যাকসন হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার সুর, নাচ আর গান আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন।



