মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ঘোষণার পর পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের খনি থাকার পরও ভেনিজুয়েলা বছরের পর বছর অর্থনৈতিক কষ্টে ধুঁকছিল। এবার সেখানে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগ আসছে। আর এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে ভেনিজুয়েলার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই মেগা ডিল? ট্রাম্পের এই চালে মার্কিন অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?
জ্বালানি তেল নিয়ে চুক্তি
কয়েক সপ্তাহের গোপন বৈঠকের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঐতিহাসিক চুক্তির ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, তাঁর নির্দেশেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ, ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সাথে আলোচনা করে এই ডিল চূড়ান্ত করেছেন। আমেরিকান করদাতাদের এক ডলারও খরচ না করে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার তেলের প্রায় ২০ শতাংশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মাজোরিটি কন্ট্রোল নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে মজার বিষয় হলো—এই নিয়ন্ত্রণে আইনগত বা আর্থিক কাঠামো কেমন হবে, কোন কোন খনি বা মার্কিন কোম্পানি এতে যুক্ত থাকবে, তা নিয়ে ট্রাম্প কিন্তু স্পষ্ট কোনো বিবরণ দেননি।
ভেনিজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতির সমীকরণ
তাহলে দুই দেশের লাভটা কী? মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতে, এটি উভয় দেশের জন্যই মাস্টারস্ট্রোক। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কম খরচে টানা তেল পাবে, যা মার্কিন বাজারে পেট্রোলের দাম কমাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, ভেনিজুয়েলায় আসবে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ, তৈরি হবে হাজার হাজার হাই-পেয়িং জব।
আর ভেনিজুয়েলার হিসাবটা আরও বড়। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, তাঁদের ১৭টি কৌশলগত তেলের খনি চালুর মাধ্যমে এই বিনিয়োগ থেকে ভেনিজুয়েলা সরকার অন্তত ২০৯ বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স রেভিনিউ বা রাজস্ব পাবে। গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নেওয়ার পর থেকে ডেলসি রদ্রিগেজ দেশটির অন্তর্বর্তী দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
আইনি জটিলতা
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার ওরিনোকো বেল্ট ও লেক মারাকাইবো এলাকার খনিগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বড় আইনি প্রশ্ন। ভেনিজুয়েলার সংবিধান ও হাইড্রোকার্বন আইন অনুযায়ী, দেশটির তেলের মূল খাতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভেনিজুয়েলা রাষ্ট্রের নিজের হাতে থাকার কথা। জ্বালানি বিশ্লেষক ডেভিড গোল্ডউইনের মতে, আমেরিকার সরকার কোনো দেশের তেলের খনি লিজ নিয়ে পরিচালনা করছে—এমন কোনো নজির বা ইতিহাস আগে কখনো নেই।
তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে ভেনিজুয়েলায় বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাতারাতি সেখানে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলন বাড়িয়ে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব।
নভেম্বরের নির্বাচন ও রাজনৈতিক চাল
তবে ট্রাম্প এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? এর মূল কারণ মার্কিন রাজনীতি। সামনেই নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচন। মার্কিনদের মূল ক্ষোভ পেট্রোলের বাড়তি দাম নিয়ে। তাই কম দামে ভেনিজুয়েলার হেভি ক্রুড অয়েল এনে মার্কিন রিফাইনারিগুলোতে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে পেট্রোলের দাম কমানোই ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা জরুরি তেলের মজুত সমৃদ্ধ করার চিন্তাও করছে ওয়াশিংটন।
যে ভেনিজুয়েলা ১৯৭০-এর দশকে তেল জাতীয়করণ করেছিল এবং হিউগো চাভেজের আমলে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো মার্কিন কোম্পানির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল—সেখানে আজ যুক্তরাষ্ট্র আবার তার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে।
ভেনিজুয়েলার বিপুল তেল ও মার্কিন বিনিয়োগের এই কেমিস্ট্রি কাগজে-কলমে দেখতে যত চমৎকারই লাগুক না কেন, আইনি ভিত্তি ও বাস্তবিক অবকাঠামোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কতটা কাজ হবে—তা এখনই বলা মুশকিল। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ গোলার্ধে নিজেদের শক্তির বড় এক বার্তা দিয়ে দিল। ট্রাম্পের এই মেগা অয়েল ডিল কি মার্কিন বাজারে সত্যিই জ্বালানির দাম কমাতে পারবে? নাকি আইনি জটিলতায় আটকে যাবে পুরো পরিকল্পনা? এটিই এখন বড় প্রশ্ন।