নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা দেখতে দেখতে ৭৫০ ছাড়িয়ে গেল, নিখোঁজ আড়াই হাজারের বেশি মানুষ। আর তিব্বতেও ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ শত শত বিদেশি নাগরিক। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে আসল আতঙ্ক এখন অন্য জায়গায়। কারণ, নদীর উজানে আটকে থাকা ধ্বংসাবশেষ নতুন নতুন কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করছে, যেগুলো যেকোনো মুহূর্তে ফেটে দ্বিতীয় দফায় বন্যা ঘটাতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি স্রেফ একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি হিমালয়জুড়ে আরও বড় কোনো মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস? নেপালের সামনে কি অপেক্ষা করছে আরও বড় কোনো বিপর্যয়?
পাহাড় আছড়ে পড়ার তাণ্ডব
ঘটনার শুরুতেই নেপাল সরকারসহ সবাই ধারণা করেছিল—হয়তো বড় কোনো ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভেতেও ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের বিস্তারিত বিশ্লেষণে আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। ইউএসজিএস স্পষ্ট জানিয়েছে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভূমিকম্পই হয়নি।
ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপ্রকৃতিবিদ ড্যানিয়েল শুগার জানান, প্রায় ০.২ বর্গকিলোমিটার আকারের একটি বিশাল বরফখণ্ড লাংটাং লিরুং চূড়ার ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে পড়ে এবং প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ে। সেই বিকট অভিঘাতেই রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার তীব্র কম্পন তৈরি হয়। দুর্যোগের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে পুরো এলাকায় অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে হু হু করে গলতে শুরু করে পাহাড়ের বরফ।
আরেকটি বন্যার আশঙ্কা কেন?
উদ্ধারকাজ চলাকালেই সামনে এসেছে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার খবর। চীন ও নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ জমে নতুন করে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা পূর্বাভাস গবেষক জেফ দা কস্তা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে উজানে নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। প্রথম বন্যায় অবকাঠামো ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে এখন যদি ছোট আকারেরও দ্বিতীয় কোনো বন্যা হয়, তবে তা পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি নিয়ে আসবে।
অবশ্য সিসিটিভির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিব্বতের একটি হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ে নিজে থেকেই শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গবেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান ও প্রতিনিয়ত এই কৃত্রিম বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণ না করলে যেকোনো মুহূর্তে দ্বিতীয় আঘাত আসতে পারে।
দুই শক্তির ভয়ংকর মেলবন্ধন!
পাহাড়ের এই ভঙ্গুর অবস্থার পেছনে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির দুটি স্থায়ী ও শক্তিশালী কারণ খুঁজে পেয়েছেন। প্রথম শক্তি—টেকটোনিক প্লেটের সচলতা। হিমালয় পর্বতমালা স্থির নয়। মাটির ভেতরের টেকটোনিক প্লেট সচল থাকার কারণে এটি প্রতিবছর অল্প অল্প করে উঁচু হচ্ছে—ঠিক যেমন কোনো গাড়িকে জ্যাক দিয়ে উঁচু করা হয়। পাহাড় যত খাড়া হচ্ছে, তার ওপরের বরফ ও পাথরের স্তরের ভারসাম্য ততটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় শক্তি—জলবায়ু পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা পাহাড়ের হিমায়িত বরফ ও মাটিকে বলেন ‘পারমাফ্রস্ট’—যা আসলে পাহাড়ের খাড়া ঢালে পাথরগুলোকে ধরে রাখার আঠা হিসেবে কাজ করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই পারমাফ্রস্ট গলে ক্ষয়ে যাচ্ছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেঞ্জামিন হর্টন বলছেন, এটি একটি ‘কমপ্লেক্স ইভেন্ট’—অর্থাৎ ভূকম্পনজনিত প্রাকৃতিক পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর এক মিথস্ক্রিয়া।
সামনে আরও বড় বিপর্যয়?
পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—নেপালের সামনে আরও বড় কোনো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে গত ৩০ বছরে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো তাদের মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহ দ্বিগুণ গতিতে গলছে। আর এই বরফ গলে পাহাড়ের উঁচুতে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার বিপজ্জনক হ্রদ।
বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘গ্লোফ’। বরফ গলে প্রাকৃতিক বাঁধে পানি জমে থাকে, আর বাঁধ ভাঙলেই কোটি কোটি লিটার পানি নিচে নেমে তছনছ করে দেয় সবকিছু।
শুধুমাত্র নেপালেই এমন ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি ইতিমধ্যেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। ২০২১ সালে ভারতের চামোলিতে ১৫টি পারমাণবিক বোমার সমতুল্য শক্তির হিমবাহ ধস হয়েছিল, ২০২৩ সালে সিকিমে এবং ২০২৪ সালে নেপালের থামে গ্রামে একই ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনার মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন কমে আসছে—যা সবচেয়ে বড় বিপদের সংকেত।
বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের ভারসাম্য দিন দিন মারাত্মক নাজুক হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়—২ হাজারের বেশি বিস্ফোরক হিমবাহ হ্রদ, দ্রুত গলতে থাকা বরফ এবং অবিরাম সচল টেকটোনিক প্লেট; এই তিনের সমন্বয়ে হিমালয় এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্নটা আর ‘যদি’ নয়, বরং ‘কখন’ এবং ‘কোথায়’ আঘাত হানবে পরবর্তী বড় বিপর্যয়।