ভারতের জন্য আবারও বড় অর্থনৈতিক চাপের খবর! রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর রাস্তা খুলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার আইনে সই করেছেন। আর এই আইনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ভারত ও চীনের মতো রুশ তেলের বড় ক্রেতাদের ওপর। পাশ হওয়া নতুন আইন ট্রাম্পকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু যদি সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়, তাহলে কি ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে? আর রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ট্রাম্পের এত রাগ কেন ভারতের ওপর?
ভারতের ওপর কেন চটলেন ট্রাম্প?
এর পেছনে মূল কারণ রাশিয়ার তেল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু ভারত রাশিয়া থেকে বড় পরিমাণে কম দামে তেল কেনা চালিয়ে যায়। ভারতের জন্য এই তেল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত তার প্রয়োজনের বড় অংশের অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। রাশিয়ার তেল তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে পাওয়া যায়, তাই ভারতীয় শোধনাগারগুলোও সেটি কিনছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমস্যা হলো—রাশিয়ার তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ মস্কোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। আর সেই অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে সাহায্য করছে—এটাই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মূল যুক্তি। এই চাপ আরও বাড়াতেই নতুন আইন করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর সুযোগ রয়েছে। ভারত ও চীন এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের বার্তা পরিষ্কার—রাশিয়ার তেল কিনলে তার শাস্তিও ভোগ করতে হবে।
কেমন ক্ষতির মুখে পড়বে ভারত?
এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। যদি সত্যিই ভারতের পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, তাহলে প্রথম ধাক্কাটা আসবে ভারতের রপ্তানিতে। সহজভাবে বললে, কোনো ভারতীয় পণ্য আমেরিকার বাজারে ১০০ টাকা দামে গেলে, তার ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক বসলে আমেরিকায় সেই পণ্যের দাম হয়ে যেতে পারে প্রায় দ্বিগুণ। ফলে আমেরিকার ক্রেতারা অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনতে চাইতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় ওষুধ, পোশাক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিকস, গয়না এবং আরও অনেক রপ্তানি খাতে।
কিন্তু শুধু রপ্তানিই নয়—আরও বড় চিন্তা তেলের বাজার নিয়ে। ভারত যদি মার্কিন চাপের কারণে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কমিয়ে দেয়, তাহলে বিকল্প দেশ থেকে তেল কিনতে হবে। আর সেই তেল যদি বেশি দামে কিনতে হয়, তাহলে ভারতের তেল আমদানির খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের জ্বালানি বাজারে। পরিবহন খরচ বাড়তে পারে, শিল্পের খরচ বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখানেও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—১০০ শতাংশ শুল্ক মানেই ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে, এমনটা এখনই বলা যাবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ শুল্ক বসবে, কোন পণ্যে বসবে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে কি না—এসবের ওপর আসল ক্ষতি নির্ভর করবে।
ভারত কী বলছে?
মার্কিন চাপের মুখে ভারতও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। নয়াদিল্লি বলেছে, দেশের ১৪০ কোটির বেশি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাই ভারত বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কেনার নীতি চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ, ভারত এখনই রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার কথা বলেনি। বরং ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করছে—রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়টি শুধু ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ব্যাপার নয়, এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও পড়তে পারে।
ভারত যদি হঠাৎ রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনা বন্ধ করে দেয়, তবে ভারতকেও অন্য উৎস থেকে তেল খুঁজতে হবে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই ভারত বলছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আর এখানেই ট্রাম্পের নতুন আইন ভারতের জন্য বড় দর-কষাকষির চাপ তৈরি করছে। একদিকে রাশিয়ার সস্তা তেল ছাড়লে ভারতের আমদানি খরচ বাড়তে পারে, অন্যদিকে রাশিয়ার তেল কিনতে থাকলে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর বড় শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, দিল্লির সামনে এখন এক কঠিন হিসাব।
তাহলে কি ভারতের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে? এখনই এমনটা বলা যাবে না। কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১০০ শতাংশ শুল্ক এখনো কার্যকর হয়নি। ট্রাম্পের হাতে এখন এই শুল্ক বসানোর ক্ষমতা এসেছে। তিনি সেটি ব্যবহার করবেন কি না, করলে কত শতাংশ করবেন এবং কোন পণ্যের ওপর করবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে ভারতের জন্য বিপদটা একেবারেই বাস্তব। কারণ একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল, আমেরিকার বাজার এবং জ্বালানি খরচ—তিনটি বিষয় এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আর ট্রাম্প যদি সত্যিই ১০০ শতাংশের কাছাকাছি শুল্ক বসান, তাহলে ভারতকে শুধু আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে নয়, নিজেদের জ্বালানি নীতিতেও বড় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াই শুধু ট্রাম্প বনাম মোদির নয়—এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় ব্যবসা, তেলের বাজার এবং সাধারণ মানুষের খরচের ওপরও।