বিশ্ব বাঁশ দিবস কীভাবে এলো?

বিশ্বের অনেক দেশেই ১৮ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় বাঁশ দিবস। বাংলায় প্রচলিত অর্থে ‘বাঁশ দেওয়া’ বলতে কাউকে বিপদে ফেলা, ক্ষতি করা, ঠকানো বা কোনো কাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করা বোঝায়। তাই বাঁশ দিবস শুনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটা কি অন্যকে বাঁশ দেওয়ার দিন? নাকি নতুনভাবে বাঁশ খাওয়ার দিন? চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক—কীভাবে এল এই দিবসটি? বাঁশকে ঘিরে কেনই বা একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন হলো?

বাঁশ দিবস কেন?

বাঁশ দিবসের সূচনা ২০০৯ সালে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বসেছিল অষ্টম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেস। ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্განიზেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই কংগ্রেসেই ১৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালন করা হচ্ছে দিবসটি।

তবে বাংলায় ‘বাঁশ দেওয়া’ কথাটির সঙ্গে এই দিবসের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সারা বিশ্বে বাঁশের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

বাঁশ আমাদের খুব পরিচিত একটি উদ্ভিদ। গ্রামে পথের ধারে, জলাধারের পাশে বা ঝোপঝাড়ে যেমন বাঁশ দেখা যায়, তেমনি শহরে দেখা যায় দোকানে, ভ্যানে কিংবা বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে।

কুটিরশিল্প থেকে নির্মাণকাজ, বাদ্যযন্ত্র থেকে খাবার—বাঁশের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে।

যেভাবে দিবসটির শুরু

বিশ্ব বাঁশ দিবসের সূত্রপাত যে বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেস থেকে, সেটি বাঁশ নিয়ে গবেষক, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের একটি বড় বৈশ্বিক সম্মেলন।

১৯৮৪ সালে পুয়ের্তো রিকোতে বসে প্রথম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেস। এরপর ১৯৯২ সালে জাপানের মিনামাতায় তৃতীয় কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ব্যাম্বু অ্যাসোসিয়েশন। ২০০৪ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে ষষ্ঠ কংগ্রেসে এটি রূপ নেয় ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্განიზেশনে। পরের বছর সংগঠনটি আইনগতভাবে যাত্রা শুরু করে।

তবে মনে রাখতে হবে, বিশ্ব বাঁশ দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্განიზেশনের উদ্যোগে পালিত একটি বৈশ্বিক সচেতনতামূলক দিবস।

২০২৬ সালের বার্তা

২০২৬ সালের বিশ্ব বাঁশ দিবসের বার্তা—‘বাঁশ, সীমানা ছাড়িয়ে’। এবারের আলোচনায় শুধু বেশি করে বাঁশ লাগানোর বিষয় নয়, বরং পরিবেশ, অর্থনীতি ও শিল্পে বাঁশের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাঁশের শিকড় মাটির নিচে ঘন জালের মতো কাঠামো তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কাঠামো মাটির ক্ষয় কমাতে এবং মাটির গুণমান রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। পানি প্রবাহের সময় কিছু ক্ষতিকর উপাদান আটকে রাখতেও এটি সহায়তা করতে পারে। তবে এর প্রভাব বাঁশের প্রজাতি, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।

কার্বন সংরক্ষণেও বাঁশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আছে। তবে শুধু বাঁশ লাগালেই হবে না। বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেললে জমা থাকা কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে। তাই বাঁশ কীভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাঁশের নতুন অর্থনীতি

বাঁশের অর্থনীতি এখন আর শুধু কুটিরশিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। নির্মাণ, আসবাব, প্রকৌশলজাত পণ্য, বস্ত্র, কাগজ, খাদ্য ও জ্বালানি—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বাঁশের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

তবে নির্মাণে বাঁশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুকানো, সংরক্ষণ, সংযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশেও বাঁশের কম্পোজিট দিয়ে আসবাব তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় কাঠের বিকল্প হিসেবে বাঁশের ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে এসেছে।

উৎপাদকরা কতটা লাভবান?

বাঁশের প্রতিটি পণ্যের পেছনে কৃষক, কারুশিল্পী, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় মানুষের শ্রম রয়েছে। তাই বাঁশভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠলে উৎপাদক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন ন্যায্য সুবিধা পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভিয়েতনামে বাঁশচাষি নারীদের সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন, পণ্য বিক্রি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে।

শুধু কত টন বাঁশ উৎপাদিত হবে, তার ওপর উদ্ভিদটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে না। কে বাঁশ উৎপাদন করবে, কে প্রক্রিয়াজাত করবে, কে পণ্য তৈরি করবে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় কে কতটা লাভ বা সুবিধা পাবে, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশে বাঁশের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশে বাঁশের ব্যবহার বহু পুরোনো। ঘরবাড়ি, বেড়া, সাঁকো, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, মাছ ধরার উপকরণ, ঝুড়ি, কুলা, ডালা—বহু কাজে বাঁশ ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে বাঁশ নিয়ে গবেষণা করছে। চট্টগ্রামের ষোলশহরে প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে ৩৬ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষিত আছে।

তবে বাঁশের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। জমি পরিষ্কার, বাঁশের স্থানীয় মূল্য কমে যাওয়া এবং ব্যাপকভাবে ফুল ধরার মতো কারণের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আবার নির্মাণকাজসহ নানা ক্ষেত্রে বাঁশের চাহিদাও রয়েছে।

তাই বাঁশের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর টেকসই উৎপাদন ও প্রজাতি সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বাঁশ শুধু গ্রামবাংলার পরিচিত একটি উদ্ভিদ নয়। অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাঁশ দিবস হতে পারে বাঁশের গুরুত্ব নতুন করে দেখার একটি সুযোগ—কীভাবে এই পরিচিত উদ্ভিদটিকে সংরক্ষণ করা যায় এবং টেকসইভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই ভাবনার সুযোগ।