হঠাৎ সৌদির তেল রপ্তানি বন্ধ হলে কী হবে?

ভাবুন, বিশ্বের অন্যতম বড় তেল সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরব হঠাৎ করে বাইরের দেশগুলোতে তেল পাঠানো বন্ধ করে দিল। কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে পারে বড় ধরনের চাপ। কারণ বিশ্ববাজারে একসঙ্গে কমে যেতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ। আর বিষয়টি এখন শুধু আশঙ্কা নয়। সৌদির তেল নিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইন ড্রোন হামলার পর বন্ধ হয়ে গেছে। এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের দিকে পাঠানো হতো। সেটি বন্ধ থাকায় সৌদির ওই পথে রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার মতো মজুতও খুব বেশি দিনের জন্য নেই।

লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে থাকা তেল দিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালানো সম্ভব। এরপর পাইপলাইন চালু না হলে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাহলে কি সত্যিই কয়েক দিনের মধ্যে সৌদির তেল ফুরিয়ে যাবে? নাকি আসল সংকটটা অন্য জায়গায়? চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।

সৌদির তেল ফুরিয়ে যাবে?

প্রথমেই বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার—সৌদি আরবের মাটির নিচের তেল কয়েক দিনে শেষ হয়ে যাবে না। এখানে “তেল ফুরিয়ে যাওয়া” বলতে বোঝানো হচ্ছে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করে রাখা তেল। সৌদি আরবের একটি বড় সুবিধা ছিল—পারস্য উপসাগর থেকে তেল নিয়ে সরাসরি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ পাঠানোর পাশাপাশি, দেশটির পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যাওয়া বিশাল একটি পাইপলাইন আছে। এই পাইপলাইন তেলকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে যায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালীতে সমস্যা হলেও সৌদি কিছু তেল অন্য পথ দিয়ে পাঠাতে পারত। কিন্তু ড্রোন হামলার পর সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সমস্যা হলো, ইয়ানবু বন্দরে যত তেল জমা আছে, তা দিয়ে দীর্ঘদিন রপ্তানি চালানো সম্ভব নয়। শিল্প খাতের কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সেখানে প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিনের মতো রপ্তানির মজুত আছে। মিসরের দুটি বন্দরে থাকা সৌদির তেলও কয়েক দিনের জন্য বাড়তি সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু সেগুলোও সীমাহীন নয়। অর্থাৎ পাইপলাইন যদি দ্রুত চালু না হয়, সৌদির রপ্তানির পরিমাণ ভয়াবহভাবে কমে যেতে পারে। আর এখানেই আসে আরও বড় হিসাব। বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ব্যবহার ও সরবরাহ হয়, তার প্রায় ৪ শতাংশের সমান।

বৈশ্বিক বাজারে ৪% ঘাটতি?

একসঙ্গে ৪ শতাংশ তেল কমে যাওয়া শুনতে হয়তো ছোট মনে হলেও তেলের বাজারে কয়েক শতাংশের পরিবর্তনও বড় ঘটনা। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে তেল সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। গাড়ি চলে জ্বালানিতে। ট্রাক চলে জ্বালানিতে। জাহাজ, বিমান, কারখানা—সব জায়গায় তেলের দরকার হয়। এমনকি অনেক পণ্য তৈরি করে বাজারে পৌঁছে দিতেও জ্বালানি লাগে। তাই তেলের সরবরাহ কমলে প্রথম ধাক্কা আসে দামে।

ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের তেল সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ। এর মধ্যে সৌদির আরও ৪০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়লে বাজারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। আর এই চাপের প্রভাব দ্রুতই দেখা যাবে তেলের দামে।

বিশ্বে এর প্রভাব কী হবে?

ধরুন, কোনো দেশের তেল আমদানির খরচ হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। তখন সেই দেশের জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে খাবার থেকে শুরু করে পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য— প্রায় সবকিছুর দামই বেড়ে যাবে। অর্থাৎ এই সংকট ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পৌঁছে যাবে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে ডিজেলের ওপর। কারণ ট্রাক, জাহাজ, কৃষির অনেক যন্ত্র এবং বিভিন্ন শিল্পে ডিজেলের ব্যবহার খুব বেশি।

তবে সৌদি আরবও বসে নেই। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইন বন্ধ থাকার পর সৌদি উপসাগরীয় বন্দর থেকে তেল পাঠানো বাড়িয়েছে। এমনকি ওমানের কাছে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল তুলে দিয়ে রপ্তানি চালু রাখার চেষ্টা করছে সৌদি আরামকো। এই বিকল্প ব্যবস্থার কারণে সৌদির কিছু তেল বাজারে পৌঁছাচ্ছে এবং বড় ধরনের ঘাটতি ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই পথে তেল পাঠাতে খরচ বেশি। জাহাজ ঘুরিয়ে নিতে হচ্ছে, নিরাপত্তা বাড়াতে হচ্ছে, আর পুরো ব্যবস্থাটিও স্বাভাবিক পাইপলাইনের মতো সহজ নয়।

সৌদির তেল কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। আসল বিপদ হলো, সৌদি আরবের তেল যদি স্বাভাবিক পথে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে রপ্তানির জন্য রাখা মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে। আর সৌদি যদি প্রতিদিনের কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেলও বাজারে দিতে না পারে, তখন সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ এই মুহূর্তে বিশ্ববাজার এমনিতেই তেলের সংকটের মধ্যে আছে।

একদিকে হরমুজে সমস্যা, অন্যদিকে লোহিত সাগরে ঝুঁকি, তার ওপর সৌদির তেল পরিবহনের প্রধান একটি পথ বন্ধ—সবমিলিয়ে তেলের বাজার এখন খুবই নাজুক অবস্থায়। তাই সৌদির একটি পাইপলাইন শুধু একটি দেশের তেল পরিবহনের পথ নয়। এটি বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পৌঁছাতে পারে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে, পরিবহন খরচে, পণ্যের দামে—এমনকি সাধারণ মানুষের পকেটেও। আর এই কারণেই আগামী কয়েক দিন সৌদির ওই পাইপলাইন চালু হয় কি না, সেটি শুধু সৌদি আরব নয়, পুরো বিশ্বের তেল বাজারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।