বিড়ালকে নতুন করে চিনতে আর কতই বা বাকি আছে? পৃথিবীর ঘরে ঘরে থাকা পোষা বিড়াল থেকে শুরু করে জঙ্গলের বাঘ, চিতা, লেপার্ড—বিড়াল পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের সঙ্গেই তো বিজ্ঞানীদের পরিচয় বহুদিনের। কিন্তু এবার এমন এক বিড়ালের সন্ধান মিলেছে, যাকে বিজ্ঞানীরাও এতদিন আলাদা প্রজাতি হিসেবে চিনতেন না!
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার ঘন জঙ্গলে পাওয়া গেছে ছোট্ট এক বন্য বিড়াল। দেখতে অনেকটা পরিচিত দাগওয়ালা বিড়ালের মতো হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল বড় এক রহস্য। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অন্য বিড়ালদের থেকে জিনগতভাবে আলাদা—অর্থাৎ এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন Leopardus tilcayo, আর স্থানীয় মানুষ আগে থেকেই এই বিড়ালকে ‘টিলকায়ো’ নামে চিনতেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এক শ বছরেরও বেশি সময় পর বিড়াল পরিবারের একটি নতুন জীবিত প্রজাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হলো। এর আগের নতুন বন্য বিড়াল প্রজাতি হিসেবে ধরা হয় ১৯২৩ সালে শনাক্ত হওয়া পাম্পাস ক্যাটকে। তাহলে এই বিড়াল এতদিন কোথায় ছিল? আর মানুষ চিনলেও বিজ্ঞানীরা কেন চিনতেন না? চলুন জেনে নিই এই বিড়ালের আদ্যপান্ত!
বিড়ালটি কেন অন্য সব বিড়ালের থেকে আলাদা?
প্রথম দেখায় টিলকায়োকে খুব বেশি অদ্ভুত মনে হবে না। এর শরীর বাদামি রঙের, গায়ে চিতাবাঘের মতো ছোপছোপ দাগ। কান ছোট ও গোল, মুখ ছোট, আর গোঁফ বেশ লম্বা। আকারেও এটি খুব বড় নয়। প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ওজন মাত্র দেড় কেজির মতো। অর্থাৎ অনেক পোষা বিড়ালের চেয়েও এটি ছোট।
কিন্তু আসল পার্থক্য চোখে দেখা যায় না। টিলকায়োকে যে ধরনের বিড়ালদের সঙ্গে আগে একসঙ্গে ধরা হতো, তাদের দেখতে প্রায় একই রকম। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা অনেক দিন বুঝতে পারেননি যে এর ভেতরে আলাদা একটি প্রজাতি লুকিয়ে আছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর ডিএনএ, অর্থাৎ প্রাণীটির শরীরের ভেতরের বংশগত তথ্য। গবেষকেরা দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ৩৮টি বিড়ালের নমুনা পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে জাদুঘরে সংরক্ষিত পুরোনো নমুনাও ছিল। ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা যায়, আগে যেসব বিড়ালকে একই ধরনের বলে মনে করা হতো, আসলে তারা পাঁচটি আলাদা প্রজাতির মধ্যে পড়ে। আর বলিভিয়ার এই টিলকায়ো তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রজাতি। গবেষকদের হিসাব বলছে, টিলকায়োর বংশধারা অন্য কাছাকাছি বিড়ালদের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, বিড়ালটি নতুন করে তৈরি হয়নি। এটি লাখ লাখ বছর ধরেই পৃথিবীতে ছিল।
১০০ বছর এই প্রজাতির বিড়াল কোথায় ছিল?
এখানেই আসল রহস্য। টিলকায়ো কোনো অজানা গ্রহে বা মানুষের চোখের আড়ালে এক শ বছর ধরে লুকিয়ে ছিল না। বরং এটি বলিভিয়ার ইউঙ্গাস এলাকার ঘন পাহাড়ি জঙ্গলে বসবাস করে আসছে। এই এলাকা খুবই আর্দ্র, কুয়াশায় ঢাকা এবং দুর্গম। অনেক জায়গায় মানুষের যাতায়াতও কম। ফলে সেখানে থাকা ছোট একটি বন্য প্রাণীকে খুঁজে বের করা সহজ নয়। আর টিলকায়োর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তার চেহারা। দেখতে অনেকটা অন্য দাগওয়ালা বিড়ালের মতো হওয়ায়, কেউ আলাদা করে সন্দেহই করেনি যে এটি অন্য প্রজাতি।
এর মানে হলো, স্থানীয় মানুষ প্রাণীটিকে চিনতেন, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটিকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে চিনতেন না। আর এখানেই বোঝা যায়—পৃথিবীর অনেক জায়গা আমরা মানচিত্রে চিনি, কিন্তু সেই জায়গের সব প্রাণীকে এখনো পুরোপুরি চিনি না।
কীভাবে এই বিড়ালের খোঁজ পাওয়া গেল?
এই গল্পের সবচেয়ে মজার অংশ হলো, বিজ্ঞানীরা জঙ্গলে গিয়ে প্রথমে এই বিড়ালটি খুঁজে পাননি। ২০১৬ সালে বলিভিয়ার এক ব্যক্তি জঙ্গলের কাছে একটি ছোট বিড়ালকে একা অবস্থায় দেখতে পান। তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো পথ হারানো একটি সাধারণ বিড়াল। তাই সেটিকে বাড়িতে নিয়ে যান। বিড়ালটি প্রায় এক বছর ওই পরিবারের সঙ্গেই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বোঝা গেল, এটি কোনো পোষা বিড়াল নয়। এর বন্য স্বভাব স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। এমনকি আশপাশের বাড়ির মুরগি তাড়ানোও শুরু করে।
শেষ পর্যন্ত পরিবারটি বিড়ালটিকে একটি বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে দিয়ে দেয়। সেই আশ্রয়কেন্দ্র থেকেই খবর যায় এক জীববিজ্ঞানীর কাছে। তিনি প্রাণীটিকে দেখে প্রথমেই বুঝতে পারেন, এখানে কিছু একটা অস্বাভাবিক আছে। বিড়ালটির মুখ, শরীরের আকার এবং গায়ের দাগ—সবকিছু পরিচিত কিছু বিড়ালের সঙ্গে মিললেও পুরোপুরি মেলেনি। সন্দেহটা তখন থেকেই শুরু। কিন্তু শুধু দেখতে আলাদা হলেই তো নতুন প্রজাতি বলা যায় না। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ গবেষণা।
বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা দক্ষিণ আমেরিকার নানা জায়গা থেকে বিড়ালের ডিএনএ সংগ্রহ করেন। পুরোনো জাদুঘরের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়। বলিভিয়ার সেই ‘অদ্ভুত বিড়াল’ আসলে এমন একটি প্রজাতি, যার বৈজ্ঞানিক নাম আগে কখনো দেওয়া হয়নি। প্রায় ১০ (দশ) বছর ধরে চলা গবেষণার পর অবশেষে এর পরিচয় নিশ্চিত হয়। আর স্থানীয় মানুষ যে নাম বহু দিন ধরে ব্যবহার করতেন, সেই টিলকায়ো নামটিই রাখা হয় নতুন প্রজাতিটির নামে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না, জঙ্গলে এই বিড়ালের সংখ্যা কত। এটি শুধু বলিভিয়ার একটি ছোট এলাকায় আছে, নাকি প্রতিবেশী দেশ পেরু ও আর্জেন্টিনাতেও আছে—সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়। এমনকি এটি কী খায়, কীভাবে বংশবিস্তার করে, কত দিন বাঁচে—এসব বিষয়েও গবেষকদের হাতে এখনো খুব কম তথ্য।
তাহলে এক শ বছর কোথায় লুকিয়ে ছিল এই বিড়াল? আসলে লুকিয়ে ছিল না। আমাদের চোখের সামনেই প্রকৃতির বিশাল এক জগতে বেঁচে ছিল। শুধু আমরা জানতাম না, তার পরিচয়টা এতটা আলাদা। একটি ছোট বিড়ালকে ঘিরে প্রায় ১০ বছরের গবেষণা শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে দিয়েছে নতুন একটি প্রজাতিকে। আর এই আবিষ্কার হয়তো আরও বড় একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীকে আমরা যতটা চিনি বলে মনে করি, প্রকৃতি তার চেয়েও অনেক বেশি রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। হয়তো কোনো দুর্গম জঙ্গলে, কোনো পাহাড়ের আড়ালে, এমন আরও প্রাণী এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে—যাদের সঙ্গে মানুষের বৈজ্ঞানিক পরিচয় এখনো হয়নি।