১৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন যাবে কোথায়?

২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর শুরু হওয়ার কথা। সেই সফরে জাপানের কাছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও সহযোগিতার প্রস্তাব তুলে ধরতে চায় বাংলাদেশ।

কী আছে বিশাল এই পরিকল্পনায়?

বিনিয়োগ ও সহযোগিতার এই পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু বিদেশি অর্থায়ন সংগ্রহ নয়, বরং আগামী পাঁচ বছরে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি করা। একদিকে মেট্রোরেল, রেলপথ ও গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প, অন্যদিকে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি—সব মিলিয়ে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে চায় বাংলাদেশ।

এই পরিকল্পনার বিস্তারিত উঠে এসেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের জন্য ১২টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অর্থ আসতে পারে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে। অর্থাৎ ১৪ বিলিয়ন ডলার অনুদান নয়। এটি এখনো প্রস্তাব। কত অর্থ আসবে, কী শর্তে আসবে, তা নির্ভর করবে আলোচনা ও প্রকল্প অনুমোদনের ওপর।

গাড়ি, চিপ ও নতুন শিল্প

পরের লক্ষ্য গাড়ি ও প্রযুক্তি। গাড়ি, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস এবং সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রযুক্তিতে প্রায় ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের কারখানা গড়া এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিপ গবেষণাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে চিপ রপ্তানি প্রায় ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় নেওয়ার লক্ষ্যও আছে। তবে লক্ষ্য আর বাস্তব সক্ষমতা এক নয়। চিপ শিল্পের জন্য দরকার উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ প্রকৌশলী, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা।

জ্বালানি ও জলবায়ু খাতে প্রস্তাব প্রায় ২৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন ও উপকূল সুরক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি, মৎস্য, সমুদ্রসম্পদ ও পর্যটনের জন্য চাওয়া হবে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

বছরে এক লাখ মানুষ জাপানে?

আরেকটি বড় লক্ষ্য টাকা নয়, মানুষ। প্রতিবছর এক লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থীকে জাপানে পাঠাতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য জাপানি ভাষা, নার্সিং, সেবাযত্ন, প্রকৌশল ও কারিগরি প্রশিক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গড়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল—এই তিন মাসে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি পড়াশোনা ও কাজের ভিসায় জাপানে গেছেন।

তবে বছরে এক লাখ পাঠানোর লক্ষ্য এখনো নিশ্চিত কোনো চুক্তি নয়। প্রয়োজন স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ নিয়োগ এবং কম অভিবাসন ব্যয়।

জাপানের লাভ কোথায়, বাধাই বা কী?

বাংলাদেশের বাজার, শিল্প উৎপাদন এবং দক্ষ কর্মী জাপানের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারে। ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ সই করেছে। এতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিয়ম সহজ করার কাঠামো তৈরি হয়েছে।

কিন্তু বাধাও আছে। জাপানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা জেট্রোর কর্মকর্তারা বাংলাদেশের করব্যবস্থা, কাস্টমস, অনুমোদনের জটিলতা ও নীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

অবশ্য জেট্রোর জরিপে প্রায় ৫৭ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান আগামী এক–দুই বছরে বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। ইআরডির হিসাবে, দেশে এখন ৩৩৮টি জাপানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্য ৫০০টি।

শুধু অর্থায়ন নয়, সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। মেট্রোরেল, বন্দর, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও রয়েছে জাপানের অর্থায়ন। তবে এবার বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু উন্নয়ন সহায়তা পাওয়া নয়; বরং জাপানের সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশটির বেসরকারি বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতাকে কাজে লাগানো।

অর্থাৎ জাপান থেকে অর্থ নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন কারখানা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করতে চায় বাংলাদেশ। আর এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে প্রস্তাবিত অর্থায়ন কতটা কার্যকর বিনিয়োগে রূপ নেয়, তার ওপর।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন শুধু জাপানের কাছ থেকে কত টাকা পাওয়া গেল, তা নয়। কত বিনিয়োগ সত্যিই এল, কত নতুন শিল্প গড়ে উঠল, কত তরুণ ভালো কাজ পেলেন এবং সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হলেন—সাফল্যের আসল হিসাব হবে সেখানেই।