ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো কাটেনি। শেখ হাসিনা, সীমান্ত হত্যা ও পানি বণ্টন নিয়ে মতবিরোধের মধ্যেই ঢাকার মেট্রোরেলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব পেল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো। সরকারি ক্রয়প্রস্তাব অনুযায়ী, প্যাকেজ দুটির মূল্য প্রায় ১৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা!
প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দূরত্বের মধ্যেও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে এত বড় কাজ দেওয়া হলো কেন? এটি কি নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, নাকি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নতুন কোনো সমীকরণ? আর এই চুক্তিতে বাংলাদেশের মানুষের লাভ কতটা?
মেট্রোরেলে কী কাজ পেল ভারত?
প্রথমেই জানা দরকার, এই কাজ পুরো মেট্রোরেল প্রকল্পের নয়। ঢাকার প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের দায়িত্ব পেয়েছে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো– এলঅ্যান্ডটি। এর একটি রেললাইন ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করবে, অন্যটি গড়ে তুলবে ট্রেন চলাচলের সংকেত, টেলিযোগাযোগ ও যাত্রীদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর। আর এই দুই প্যাকেজের মূল্যই সামনে এনেছে বড় অঙ্কের এই চুক্তিকে।
কিন্তু চুক্তির গুরুত্ব শুধু টাকার অঙ্কে নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় ঘটনাটি কেন আলোচনায়, তা বুঝতে হলে আগে জানতে হবে—এলঅ্যান্ডটি আসলে কী কাজ পেয়েছে এবং প্রকল্পটির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা জড়িত।
মেট্রোরেলের মহাপরিকল্পনা
ঢাকার যানজট কমাতে সরকার একাধিক মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ মেট্রোরেল লাইন-১। প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প বাংলাদেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি বা ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, এতে বিমানবন্দর ও পূর্বাচল—দুটি রুটে মোট ২১টি স্টেশন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থায়নে রয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, জাইকা। তবে পুরো কাজ ভারতকে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন প্যাকেজে বাংলাদেশ, জাপান, চীনসহ একাধিক দেশের প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এলঅ্যান্ডটি পেয়েছে দুটি নির্দিষ্ট প্যাকেজ, যেগুলো ছাড়া মেট্রোরেলের কার্যকর পরিচালনা সম্ভব নয়।
ঠিক কী কাজ পেল
সরকারি ক্রয়প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, সিপি-০৯ প্যাকেজের প্রস্তাবিত মূল্য ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই কাজ এলঅ্যান্ডটি করবে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের সঙ্গে। এতে থাকবে রেললাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, ট্র্যাকশন সাবস্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক অবকাঠামো। নকশা তৈরি থেকে শুরু করে সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও চালুর দায়িত্বও থাকবে তাদের।
দ্বিতীয় প্যাকেজ সিপি-১০-এর প্রস্তাবিত মূল্য ৬ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর আওতায় তৈরি হবে সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর। সহজ করে বললে, সংকেতব্যবস্থা ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে, টেলিযোগাযোগ নিশ্চিত করবে চালক ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে যোগাযোগ। আর প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর যাত্রীদের রেললাইনে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।
দুই প্যাকেজের প্রস্তাবিত মোট মূল্য প্রায় ১৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। তবে এলঅ্যান্ডটির ২৭ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট চুক্তিমূল্য জানানো হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাসে এই কাজকে ৫ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির ‘মেজর অর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই দুই হিসাব এক নয়।
সম্পর্কের বরফ গলছে?
এলঅ্যান্ডটি বাংলাদেশের মেট্রোরেল খাতে নতুন নয়। ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল লাইন-৬-এর সমন্বিত রেলব্যবস্থা স্থাপনের কাজও প্রতিষ্ঠানটি করেছে। ফলে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এই চুক্তি কি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সংকেত? এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত ১৬ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ উপযুক্ত কূটনৈতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো রয়েছে।
তবু দুই দেশের বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা চলতে পারে। কারণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যোগাযোগ, বাজার, জ্বালানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে উভয়ের স্বার্থ জড়িত। এই প্রকল্পে জাইকার অর্থায়নও মনে করিয়ে দেয়, এখানে বাংলাদেশের পরিকল্পনা, জাপানের অর্থায়ন এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করছে।
লাভ হবে কার?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই প্রকল্পে সাধারণ মানুষ কী পাবেন? পরিকল্পনা অনুযায়ী, লাইন-১ চালু হলে বিমানবন্দর, কমলাপুর, নতুন বাজার ও পূর্বাচলের মধ্যে যাতায়াত সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যানজটে সময় নষ্ট কমলে কর্মঘণ্টা বাঁচতে পারে, গণপরিবহন আরও নির্ভরযোগ্য হলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতাও কমতে পারে।
তবে এসব সুবিধা নিশ্চিত নয়। কাজ সময়মতো শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং নির্মাণের মান বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত, ব্যয় ও অগ্রগতির তথ্য জনসমক্ষে রাখা এবং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্ব পাওয়া বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একটি চুক্তিই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলেছে, এমন প্রমাণ নয়।
প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যাবে অমীমাংসিত কূটনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার মাধ্যমে। আর বাংলাদেশের দৃষ্টিতে সবচেয়ে জরুরি হলো—কাজ যে দেশের প্রতিষ্ঠানই করুক, প্রকল্পটি কতটা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হচ্ছেন।


