একসময় তাঁকে ‘পাপ্পু’ বলে বিদ্রূপ করত বিজেপি। রাজনৈতিক প্রচারে দুর্বল ও অপরিণত নেতা হিসেবে তুলে ধরা হতো। পরপর দুই লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি, নিজের নির্বাচনী পরাজয়—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, রাহুল গান্ধী কি আদৌ নরেন্দ্র মোদির প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন?
কিন্তু পদযাত্রা, প্রচারের কৌশল বদল আর বিরোধী জোটের সমীকরণে বদলেছে রাজনীতির চিত্র। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ায় কংগ্রেস, আর রাহুল হন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা। কিন্তু এই উত্থান কতটা তাঁর নিজের, আর কতটা বিরোধী জোটের সম্মিলিত সাফল্য? কীভাবে বদলে গেল ‘পাপ্পু’ থেকে মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার গল্প? সেই উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে একেবারে শুরুতে।
উত্তরাধিকারের ভার
রাহুল গান্ধীর রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই তাঁর পরিবারের নাম ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। দাদি ইন্দিরা গান্ধী ও বাবা রাজীব গান্ধীও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মা সোনিয়া গান্ধী দীর্ঘদিন কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এই উত্তরাধিকার তাঁকে রাজনীতিতে পরিচিতি ও সুযোগ দিয়েছে। ২০০৪ সালে উত্তর প্রদেশের আমেথি থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন রাহুল। কিন্তু পরিবারের রাজনৈতিক পরিচিতি আর নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। কংগ্রেসের ক্রমাগত দুর্বলতা তাঁর ওপরও চাপ তৈরি করে। কিন্তু নিজের নেতৃত্ব প্রমাণের পরীক্ষাটা বাকি ছিল।
দুই নির্বাচনের ধাক্কা
এই পরীক্ষায় বড় ধাক্কা আসে ২০১৪ সালে। ভারতের সংসদবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরএসের হিসাব বলছে, কংগ্রেস সেবার পায় মাত্র ৪৪টি আসন। ২০১৯ সালে সংখ্যাটি হয় ৫২। অন্যদিকে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি টানা দুবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
২০১৯ সালে আমেঠিতে স্মৃতি ইরানির কাছে নিজেও হারেন রাহুল। যদিও ওয়েনাডে জেতায় সংসদে থাকেন। নির্বাচনী ব্যর্থতার দায় নিয়ে কংগ্রেসের সভাপতিপদও ছাড়েন। পরিবারের পুরোনো দুর্গে এই হার প্রশ্নটা আরও জোরালো করে: পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে মানুষকে টানার ক্ষমতা কতটা আছে তাঁর?
রাজপথে নতুন পরিচয়
এরপর বদলের সবচেয়ে দৃশ্যমান ছবি আসে রাজপথে। ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয় ভারত জোড়ো যাত্রা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শ্রীনগরে শেষ হয় এই পদযাত্রা।
মানুষের সঙ্গে হাঁটা, কথা বলা, তাঁদের অভাব-অভিযোগ শোনা—রাহুলকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। কংগ্রেসের ভাষ্য ছিল, বিভাজনের বিরুদ্ধে মানুষকে এক করা এবং বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সামনে আনা এই যাত্রার উদ্দেশ্য। দলীয় মঞ্চের বাইরে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান তিনি।
তবে পথটা মসৃণ ছিল না। ২০২৩ সালের মার্চে মানহানির মামলায় দুই বছরের সাজা হলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট দোষী সাব্যস্ত করার রায় স্থগিত করে। এরপর সংসদ সদস্যপদ ফিরে পান তিনি। এই স্থগিতাদেশ অবশ্য মামলা থেকে খালাসের রায় ছিল না।
প্রচারে নতুন কৌশল
২০২৪ সালের ভোটের আগে মণিপুর থেকে ভারত জোড়ো ন্যায়যাত্রা শুরু করেন তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও গণতন্ত্রের মতো বিষয় সামনে আসে এই কর্মসূচিতে। রয়টার্সের মূল্যায়ন ছিল, এই যাত্রাগুলো দলীয় কর্মীদের উৎসাহ দিয়েছে এবং রাহুলের ভাবমূর্তি পাল্টাতে সাহায্য করেছে।
বদল আসে প্রচারের বিষয়েও। ২০২৪ সালের নির্বাচনে চাকরি, সামাজিক বৈষম্য, জাতভিত্তিক জনগণনা ও সংবিধান রক্ষার কথা সামনে আনেন রাহুল। জনগণনার দাবি ছিল বিভিন্ন জাতের মানুষের সংখ্যা ও আর্থসামাজিক অবস্থার হিসাব জানার। রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে আসে, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সংরক্ষিত চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ হারানোর আশঙ্কা বিরোধীদের প্রচারে গুরুত্ব পায়। বিজেপি অবশ্য সেই আশঙ্কা নাকচ করে।
ভোটে নতুন সমীকরণ
ফলাফলে ধরা পড়ে নতুন সমীকরণ। পিআরএসের হিসাবে, ২০২৪ সালে কংগ্রেস পায় ৯৯টি আসন। বিজেপি ৩০৩ থেকে নেমে আসে ২৪০টিতে। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২৭২টি আসন। ফলে মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলেও সরকার গড়তে হয় জোটসঙ্গীদের সমর্থন নিয়ে।
তবে এই ফল শুধু রাহুলের অর্জন নয়। দল পরিচালনায় ছিলেন সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। আঞ্চলিক দলগুলোর শক্তি ও বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিভিন্ন আসনে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে সমঝোতা করে বিরোধীরা। উত্তর প্রদেশে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি পায় ৩৭টি আসন। তাই রাহুলের উত্থান বুঝতে জোটের শক্তিকেও হিসাবে রাখতে হবে।
রাহুল নিজে রায়বেরেলি ও ওয়েনাড—দুই আসনেই জেতেন। পরে রায়বেরেলি রেখে ওয়েনাড ছাড়েন। ভারতের সংসদের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে তিনি লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা হন। দশ বছর পর লোকসভা পায় আনুষ্ঠানিক বিরোধীদলীয় নেতা। সরকারের জবাবদিহি চাওয়ার লড়াইয়ে এটি তাঁকে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যায়।
সংসদের বাইরেও লড়াই
সংসদের বাইরেও সেই লড়াই চলছে। রয়টার্স জানায়, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভে ২০২৬ সালের ৬ ও ৭ অক্টোবর রাহুলকে সাময়িকভাবে আটক করে পুলিশ। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধনে বিজেপি সুবিধা পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি তা অস্বীকার করেছে। ১২ অক্টোবর বিরোধীরা সংশোধন স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টেও আবেদন করে।
সামনে কঠিন পরীক্ষা
কিন্তু প্রতিবাদে সামনে থাকা আর দেশজুড়ে ভোটে জেতা এক পরীক্ষা নয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেরালায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট জিতেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার সরকার গড়েছে বিজেপি। রয়টার্স ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন এই দুই চিত্রই তুলে ধরে। ফলে ২০২৪ সালের সাফল্যেই মোদির রাজনৈতিক শক্তি ফুরিয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত চলে না।
রাহুল এখন বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হতে হলে কংগ্রেসের সংগঠন শক্ত করতে হবে, জোটের ঐক্য রাখতে হবে, মানুষের সমস্যার কার্যকর সমাধানও দেখাতে হবে। তাঁর সামনে তাই আসল প্রশ্ন: নিজের বদলে যাওয়া পরিচয়কে কি তিনি ধারাবাহিক নির্বাচনী জয়ে রূপ দিতে পারবেন?