দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি আর সি চিন পিং মুখোমুখি বসে হ্যান্ডশেক করছেন, গ্লোবাল মিডিয়াতে আলোচনা—দুই দেশের সম্পর্ক নাকি বরফ গলতে শুরু করেছে! কিন্তু ঠিক এই একই সময়ে অরুণাচল সীমান্তে নিঃশব্দে কী ঘটছে জানেন?
স্যাটেলাইট ছবি বলছে—একদিকে দিল্লিতে কূটনৈতিক বন্ধুত্ব, আর অন্যদিকে অরুণাচল সীমান্তে চীনের নীরব আগ্রাসন! শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, স্থানীয় আদিবাসীদের হাজার বছরের পুরোনো চারণভূমিও নাকি গ্রাস করে নিচ্ছে বেইজিং! মোদির বৈঠকের পেছনে চীন কি তবে অরুণাচল দখলের নতুন চাল চালছে? চলুন, বিষয়টা একটু সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক।
বিরোধটা ঠিক কোথায়?
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের একটা বিশাল সীমান্ত আছে। আর এই সীমান্তের একটা বড় অংশই কিন্তু আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত নয়! ভারত অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। অন্যদিকে, চীন দাবি করে অরুণাচল নাকি তাদেরই অংশ, যার নাম তারা দিয়েছে ‘জাংনান’ বা ‘দক্ষিণ তিব্বত’। সমস্যাটা শুধু তাত্ত্বিক নয়, একদম মাটির বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন—তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির কাছে গত কয়েক বছরে চীনের নির্মাণের গতি আকাশচুম্বী হয়েছে! কোথাও নতুন ভবন, কোথাও রাস্তা প্রশস্ত করা, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে একের পর এক নতুন হেলিপ্যাড।
বিশেষ করে ‘ঝারি’ শহরের আশপাশের নির্মাণকাজ বিশেষজ্ঞদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। সেখানে বিশাল সব প্রকৌশল যন্ত্রপাতি এবং সিমেন্ট তৈরির প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা পরিষ্কার বলছেন—এগুলো শুধু সাধারণ উন্নয়নমূলক কাজ নয়, এর পেছনে পরিষ্কার সামরিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
ইঞ্চি ইঞ্চি করে জমি হারানোর যন্ত্রণা
কিন্তু স্যাটেলাইটের বাইরে মাঠের পরিস্থিতি কী বলছে? স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী বলছেন, তাঁরা শুধু দূর থেকে চীনের অবকাঠামো দেখছেন না, বরং নিজেদের পূর্বপুরুষের জমিতে তার মারাত্মক প্রভাব টের পাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, চীনা বাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে চলে এসেছে! যেখান থেকে তারা একসময় গবাদি পশুর জন্য খাবার সংগ্রহ করতেন বা পশু চরাতেন, সেখানে এখন কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস থেকেই এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। অরুণাচলের তাগিন জনগোষ্ঠীর একটি সংগঠন ‘অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ ওইয়াক ও মোলে ওতাকসিং এলাকায় গিয়ে সরেজমিন তদন্ত চালিয়েছে। তাদের বিস্ফোরক দাবি—আগে যেসব এলাকায় নিয়মিত ভারতীয় সেনারা টহল দিত, এখন সেখানে চীনা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, তাঁরা প্রতিদিন আক্ষরিক অর্থেই ‘ইঞ্চি ইঞ্চি করে’ নিজেদের জমি হারাচ্ছেন। অথচ এই অভিযোগের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে ভারত ও চীন। ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্তে চীনা অনুপ্রবেশের খবরকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। আর বেইজিংয়ের দাবি—চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নাকি সম্পূর্ণ ‘স্থিতিশীল’। এখন প্রশ্ন হলো—স্থানীয়রা দেখছেন পরিবর্তন, স্যাটেলাইট দেখাচ্ছে নির্মাণ, আর সেনাবাহিনী বলছে সব ঠিক আছে! তাহলে আসল সত্যিটা কী?
চীনের ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল
এই পুরো ব্যাপারটাকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী একটি দারুণ উপما দিয়ে বুঝিয়েছেন। তিনি একে বলছেন—‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশল। ব্যাপারটা কেমন? ধরা যাক, মাংস একবারে না কেটে, খুব পাতলা পাতলা স্লাইস করে কাটা হলো। চীন ঠিক এই কাজটাই করছে! একবারে বড় কোনো আক্রমণ বা যুদ্ধ বাধিয়ে তারা দেশ দখল করছে না। বরং ধীরে ধীরে, অত্যন্ত কৌশলে একটু একটু করে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
প্রথমে একটা ছোট শেড, তারপর রাস্তা, এরপর স্থায়ী পাকা ভবন—এভাবেই বছরের পর বছর ধরে তারা ভূখণ্ডের কৌশলগত বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। আর এখানেই সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছে চীন। কারণ তিব্বত অংশে চীন বহু বছর আগেই রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে। অন্যদিকে, আমাদের সীমান্তবর্তী অনেক এলাকা এখনো অত্যন্ত দুর্গম। এমনকি স্থানীয়দের আক্ষেপ, সীমান্তের ভারতীয় গ্রামগুলোতে এখনো বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট বা ভালো শিক্ষার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার বড় অভাব রয়েছে। জীবনযাত্রার টানে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছে। আর সীমান্তগুলো যদি এভাবে জনশূন্য হয়ে পড়ে, তবে সেটা শুধু স্থানীয় মানুষের সমস্যা নয়, গোটা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটা বিরাট টাইম বোমা।
সি চিন পিংয়ের সফরের আসল তাৎপর্য
অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই ভারত সরকারও। সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোকে জনবহুল ও শক্তিশালী রাখতে চালু করা হয়েছে ‘ভাইব্রেন্ট ভিলেজ’ কর্মসূচি। অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুও জানিয়েছেন, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নত করতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দারুণ গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই গতি কি চীনের হাই-স্পিড নির্মাণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা এসেই যায় বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। ঠিক এই সময়ে, যখন বছরের পর বছর ধরে চলা হিমশীতল বরফ গলিয়ে সি চিন পিং আবার দিল্লিতে পা রেখেছেন, ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশ যখন বন্ধুত্বের বার্তা দিচ্ছে—ঠিক তখনই সীমান্তে কেন এই উত্তেজনার খবর আসছে?
এর উত্তর একটাই: দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলের হাসি-ঠাট্টা আর হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ের বাস্তব মাঠপর্যায়ের চিত্র দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না যে চীন ভারতের জবরদস্তিতে কোনো বড় ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার—হিমালয়ের এই বরফাবৃত সীমান্তে রাস্তাঘাট, হেলিপ্যাড আর সামরিক অবকাঠামো যত বাড়ছে, দুই দেশের স্নায়ুযুদ্ধও তত গভীরে প্রবেশ করছে।
সীমান্তের এই লড়াই শুধু মানচিত্রের কয়েক ইঞ্চি জায়গা নিয়ে নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, স্থানীয় মানুষের বসতি এবং দেশের অখণ্ডতার লড়াই। দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে যাই ঘটুক না কেন—শেষ পর্যন্ত হিমালয়ের মাটি ও বাস্তব পরিস্থিতিই ঠিক করে দেবে ভারত-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে।



