বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। দেশটির অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে এ খাতের ওপর। এবার ভিন্ন একটি দিকে নিজেদের জড়াতে চাইছে দেশটি। সে খাতে শীর্ষে যেতে চাইছে। চাইছে তেলনির্ভরতা থেকে বের হতে। আর তা হলো খেলা।
বিশ্বের জনপ্রিয় খেলাগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের নাম যুক্ত করতে চাইছেন দেশটির যুবরাজ ও কার্যত (ডি-ফ্যাক্টো) শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। এর মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট, গলফ, ফর্মুলা ওয়ান, বক্সিং ও বাস্কেটবল অন্যতম। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বলছে, ভবিষ্যতে খেলায় নেতৃত্ব দিতে সৌদি আরব বাড়িয়েছে তৎপরতা।
এরই মধ্যে গলফে সুখবর পেয়েছে সৌদি আরব। দুই বছর ধরে চলা এক অদৃশ্য ‘গৃহযুদ্ধ’ অবশেষে শেষ হলো। শান্তিপূর্ণ সমাধান এল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিজিএ ট্যুর ও ইউরোপের ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুরের সঙ্গে একত্র হয়েছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তহবিলে চালু হওয়া এলআইভি গলফ সার্কিট। এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে সৌদির।
২০২১ সালের অক্টোবরে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) আর্থিক সহায়তায় সৌদি আরবে প্রতিষ্ঠিত হয় এলআইভি গলফ। আর প্রতিষ্ঠার পরই মোটা অঙ্কের ডলার দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় গলফারদের। এতে ফিল মিকেলসন এবং ব্রুকস কোয়েপকারের মতো প্রথম সারির অনেক গলফার নাম লেখান এলআইভিতে। তবে টাইগার উডস, ররি ম্যাকলরয়রা থেকে যান পিজিএ ট্যুরের সঙ্গেই।
এবার তিন আয়োজক পিজিএ ট্যুর, ডিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর ও এলআইভি গলফ এক হয়ে যাওয়ায় গলফের তারকাদের সবাইকেই পাবে সৌদি আরব। আর তাতে গলফে দেখাতে পারবে আধিপত্য। আসবে মোটা অঙ্কের অর্থও।
গলফ নিয়ে এখন আর বেশি ভাবতে হবে না যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে। এবার তাই ফুটবলের দিকে নজর দিয়েছে সৌদি আরব। স্কটল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য হেরাল্ডে শুক্রবার (৯ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে এবার মোটা অঙ্কের অর্থ আয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে সৌদি। কারণ হিসেবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের একটি ফোনের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল একটি নতুন ফোন উন্মোচন করেছে। যাতে থাকবে খেলা নিয়ে বিশেষ কিছু ফিচার। আর সে জন্য প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে অ্যাপলকে। মনে করা হচ্ছে, সৌদি আরবের ফুটবল লিগ কর্তৃপক্ষ এতে যুক্ত হতে পারে।
অ্যাপলের এমন ঘোষণার দিনই জানা যায়, ব্যালন ডি’অর জয়ী ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার করিম বেনজেমা রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে যুক্ত হয়েছেন সৌদি ক্লাব আল-ইতিহাদে। দুই বছরের জন্য এ ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করেছেন এ তারকা। পরদিন শোনা গেল, চেলসির মিডফিল্ডার ফ্রান্সের আরেক তারকা এনগোলো কন্তেও একই ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন। আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি সৌদি আরবের ক্লাবে যোগ দেবেন বলে গুঞ্জন শুরু হলেও তা আর হয়নি। আগেই সৌদি আরবের আরেক ক্লাব আল-নাসরে নাম লেখান পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
ফুটবলে সৌদি আরবের চোখ এখন ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের দিকে। গ্রিস ও মিসরের সঙ্গে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের আয়োজক দেশ হতে চায় তারা। এ জন্য গ্রিস ও মিসরকে লোভনীয় অফারও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের তিনটি ম্যাচ সৌদি আরবের মাঠে আয়োজন করতে দিলে বিনিময়ে দেশ দুটিতে স্টেডিয়াম নির্মাণে অর্থায়ন থাকবে সৌদির।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জানা যাবে, ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কারা হবে। এর আগে তদবির চালিয়ে যাবে সৌদি আরব।
ফর্মুলা ওয়ানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এরই মধ্যে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে সৌদি আরব। অ্যাস্টন মারটিন এফ ওয়ানের টাইটেল স্পন্সরে রয়েছে সৌদি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরামকোর নাম। সৌদির মরুভূমিতে হতে যাওয়া নিওম শহর নির্মাণে অংশীদার স্পোর্টস কার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাকলারেন। সৌদি আরব চাইছে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন তাদের দেশে হোক।
গত জানুয়ারিতে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সৌদি অটোমোবাইল অ্যান্ড মোটরসাইকেল ফেডারেশনের সভাপতি প্রিন্স খালিদ বিন সুলতান আল-ফয়সাল। তিনি বলেন, অ্যাস্টন মারটিন বা ম্যাকলারেন সৌদি আরবে তাদের প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে নিজেদের দেশেই গাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হবে। আর এতে এ শিল্পে এগিয়ে যাবে তারা।
প্রিন্স খালিদ বিন সুলতান আল-ফয়সালের এ মন্তব্যের পরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ হাজার কোটি ডলার দিয়ে ফর্মুলা ওয়ান কিনে নিতে চায় সৌদি আরব। যদিও দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
টাইসন ফিউরি, অ্যান্থনি জশুয়া, অলেকসান্দার ইউসুক ও ডিওন্টাই উইল্ডারকে নিয়ে বক্সিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। এমনকি নারী বক্সারদের নিয়েও প্রতিযোগিতার চেষ্টা করছে দেশটি। সংবাদমাধ্যম কোয়ার্টজের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
বাস্কেটবলের দিকে এখনো তেমনভাবে ঝোঁকেনি সৌদি আরব। তবে এরই মধ্যে জাতীয়ভাবে এ খাতে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশ্ব স্নুকার ট্যুর ইভেন্ট আয়োজন করবে সৌদি আরব। আর ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা তো দেশটিতে এমনিতেই রয়েছে। এ খেলাকে এখন বাণিজ্যিক করবে দেশটি।
হালের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট নিয়েও ভাবছে সৌদি আরব। ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ আইপিএলের মতো জনপ্রিয় আসরের আয়োজন করতে চায় তারা। আসরের ফরমেট হবে টি-২০। বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মাদের মতো তারকাদের নিয়ে আসা হবে। এ ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডে কড়া নাড়তে শুরু করেছেন দেশটির প্রতিনিধিরা।
আর কোন খেলা বাকি আছে? সবচেয়ে বড় আসরই তো বাকি, অলিম্পিক। সে দিকেও এরই মধ্যে এক পা দিয়ে রেখেছে সৌদি আরব। ২০২২ সালের অক্টোবরে জানানো হয়, এশিয়ার শীতকালীন গেমসের ২০২৯ সালের আসর বসতে যাচ্ছে সৌদি আরবে। নির্মিতব্য শহর নিওমে এ আসরের খেলা অনুষ্ঠিত হবে। এর পাঁচ বছর পর আরও বড় আসরের দায়িত্ব পাবে দেশটি। এশিয়ান গেমসের ২০৩৪ সালের আসর বসবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। এবার অলিম্পিকের আয়োজক দেশ হওয়ার প্রচেষ্টা শুরু করেছে দেশটি। সেটি পেলে তা হবে সোনায় সোহাগা।
যেভাবে সৌদি আরব এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হতেই পারে দেশটি ভবিষ্যতে খেলায় আধিপত্য বিস্তার করবে। আর এ খাত থেকে বিপুল আয় করবে এবং তেলনির্ভর অর্থনীতি কমিয়ে দেবে। তবে দেশটির সংস্কৃতির সঙ্গে এসব খেলা সাংঘর্ষিক হওয়ায় দেখার বিষয়, কোন কৌশলে সামনে এগিয়ে যাবেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।