পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে বিরল প্রজাতির একটি জীবিত অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সৈকতের ডিসি পার্ক-সংলগ্ন এলাকায় কচ্ছপটি দেখতে পান স্থানীয় ফটোগ্রাফার সাইফুর ইসলাম। পরে তিনি বিষয়টি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন’ (উপরা)-কে জানালে সংগঠনের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কচ্ছপটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধার হওয়া কচ্ছপটি অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপ (Lepidochelys olivacea) প্রজাতির বলে নিশ্চিত করেছেন পরিবেশকর্মীরা। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি ওজনের এ কচ্ছপটি সাধারণত ‘প্যাসিফিক রিডলি’ নামেও পরিচিত। এটি পৃথিবীর উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্র অঞ্চলে বিচরণ করে। প্রধানত ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে এদের উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ জলেও এদের বিচরণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এ প্রজাতিকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে সৈকতে হাঁটার সময় কচ্ছপটিকে ঢেউয়ের ধারে দুর্বল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে সেটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে উপরা’র সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন এবং বন বিভাগ ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।
উপরা’র আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি এটি একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী অলিভ রিডলি কচ্ছপ। সাধারণত এ সময় স্ত্রী কচ্ছপগুলো ডিম পাড়ার জন্য উপকূলের নিরিবিলি সৈকতে চলে আসে। হয়তো ডিম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এটি কুয়াকাটা উপকূলে এসেছে। তবে কচ্ছপটিকে বেশ দুর্বল ও ক্লান্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সমুদ্রে মাছ ধরার জালে আটকে গিয়ে আঘাত পাওয়া, দীর্ঘসময় পানির বাইরে থাকা কিংবা প্লাস্টিক বর্জ্য খাওয়ার কারণেও এমন পরিস্থিতি হতে পারে। আমরা কচ্ছপটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে রেখেছি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কচ্ছপটির শরীরে কোনো গভীর আঘাত রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’
কুয়াকাটা বন বিভাগের ক্যাম্প কর্মকর্তা মো. রুবেল বলেন, ‘অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপ আমাদের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এ ধরনের প্রাণী খুব একটা দেখা যায় না। স্থানীয়দের দ্রুত তথ্য দেওয়ার কারণে কচ্ছপটিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আমরা কচ্ছপটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে। সুস্থ হওয়ার পর নিরাপদ পরিবেশে সমুদ্রে অবমুক্ত করা হবে।’
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘সমুদ্রে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য, জলদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবাধ মাছ শিকারের কারণে সামুদ্রিক কচ্ছপের আবাস ও প্রজনন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ডিম দেওয়ার মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় অনেক কচ্ছপই বিপদে পড়ে।’
কুয়াকাটা সৈকতে বিরল এ অলিভ রিডলি কচ্ছপের উপস্থিতি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা। তবে এ ধরনের প্রাণী সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।