একদিন মুক্তির অপেক্ষায় ছিলেন। একের পর এক মামলায় জামিনও মিলেছিল। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, হাসপাতালের বিছানা থেকে একদিন সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন আপনজনদের কাছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হলো না। হাতের হাতকড়া খুললেও জীবনের শিকল আর ছিঁড়ল না। না-ফেরার দেশে চলে গেলেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান (মনির খান)।
বুধবার বিকেল ৩টার দিকে ঢাকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। টানা প্রায় দুই মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে থেমে যায় তার জীবনযুদ্ধ।
পারিবারিক সূত্র জানায়, মনির খান পটুয়াখালী সদর উপজেলার বহালগাছিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল খালেক খানের ছেলে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ছাত্রলীগের বিভিন্ন দায়িত্ব এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোড এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও পটুয়াখালীতে মোট ৯টি মামলা ছিল। দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারাবন্দি জীবনে একের পর এক মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হওয়ায় কারামুক্তি আর মেলেনি।
তার স্ত্রী, কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোসাম্মদ সালমা জাহান জানান, গত ৯ জুন কারাগারে থাকা অবস্থায় মনির খান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৪ জুন আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং দুই দিন পর লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ জুলাই শেষ মামলাতেও তিনি জামিন পান। পরিবারের আশা ছিল, এবার হয়তো হাসপাতাল থেকেই মুক্ত মানুষ হিসেবে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ভাগ্য অন্য গল্প লিখেছিল। মুক্তির কাগজ এলেও আর জাগেননি তিনি।
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার হাতে হাতকড়া পরানো একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে পরিবারের আবেদনের পর হাতকড়া খুলে দেওয়া হলেও তার শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি।
মনির খানের চাচা আব্দুল কালাম আজাদ জানান, তার জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে পটুয়াখালী সদর উপজেলা মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দীর্ঘ কারাবাস, হাসপাতালের আইসিইউ, লাইফ সাপোর্ট, শেষ পর্যন্ত মুক্তির কাগজ সবকিছুর পরও আর ঘরে ফেরা হলো না মনির খানের। অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের চোখে রয়ে গেল শুধু অশ্রু, আর একটি অপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের গল্প।