ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইন হলেও এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে লেভেলক্রসিংগুলো। লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান এবং গেট না থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়ক পথের যানবাহনের সঙ্গে ক্রসিংয়ে ট্রেনের সংঘর্ষে কিংবা ট্রেনে কাটা পড়ে বাড়ছে প্রাণহানি।
সড়ক নির্মাণ কর্তৃপক্ষ এলজিইডি, উপজেলা পরিষদ কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের এবং রেল কর্তৃপক্ষের ঠেলাঠেলিতে এসব লেভেল ক্রসিং অনিরাপদ থেকে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে থানার তথ্যমতে, চলতি বছর কুমিল্লার লাকসাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথে দুর্ঘটনায় ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫৭টি। লাকসাম-আখাউড়া ৭৬ কিলোমিটার রেলপথে অরক্ষিত অবৈধ লেবেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৩৮টি। যার মধ্যে ৩১টি লেভেলক্রসিংয়ে রাস্তা নির্মাণের দায়িত্ব এলজিইডি কর্তৃপক্ষের।
কুমিল্লার রেলওয়ের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পথ) মো. লিয়াকত আলী মজুমদার জানান, এলজিইডিসহ বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রেলওয়ের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়েই রেল লাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে। বিনা অনুমতিতে যেসব রাস্তা রেললাইনের ওপর দিয়ে যায় সেগুলোর ক্রসিংকেই আমরা অবৈধ লেভেল ক্রসিং হিসেবে বলে থাকি।
তিনি বলেন, এসব লেভেল কোচিংয়ে গেটম্যান এবং গেট দেওয়ার ব্যবস্থাপনার রেল কর্তৃপক্ষের থাকলেও সড়ক নির্মাণ কর্তৃপক্ষ সেজন্য সাথে কিছু ব্যবস্থাপনা মেনে চলতে হয়। নিয়মাবলীর মধ্যে তিন বছরের জন্য সড়ক কর্তৃপক্ষ গেটম্যানের বেতন ও গেটের খরচ বহন করার কিছু নিয়ম রয়েছে। না হলে সেসব ক্রসিংগুলোকে নিরাপদ করা যাচ্ছে না। সড়ক বিভাগ আমাদের সহযোগিতা না করলে আমরা শুধু সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দিতে পারি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম মজুমদার বলেন, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর সাথে এ বিষয়ে বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি কুমিল্লা জেলায় নতুন এসেছি, তাই পূর্ববর্তী সময়ে কেন লেভেল ক্রসিং গুলোতে গেট দেয়া হয়নি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময় কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হলেও সেগুলো কখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়সার বলেন, কোনো লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত থাকতে পারবে না। রেলপথ কিংবা সড়ক বিভাগ যে কেউ এসব লেবেল কোচিং গুলোতে গেট এবং গেটম্যান দিয়ে নিরাপদ করতে হবেই। আমরা কারো অবহেলার দায় প্রাণ দিয়ে দিতে পারি না। কুমিল্লার লেভেল ক্রসিং গুলোকে নিরাপদ করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গত মঙ্গলবার বুড়িচং উপজেলার কালিকাপুর অবৈধ লেভেল ক্রসিং এ সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের ঢাকায় অটো রিক্সার ৭ যাত্রী নিহত হযন। এই ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকাবাসী। বুড়িচং উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জাবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এর আগেও এসব লেভেল কোচিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েও গেইট কিংবা গেইটমান কিছুই দেয়নি। এলাকাবাসী সেটি মেনে নেবে না। এভাবে লেভেল ক্রসিংয়ে মানুষ প্রাণ হারালে প্রশাসনের প্রতি আরও ক্ষোভ জমে উঠবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল জানান, কিছুদিন আগেও রাজাপুর রেলস্টেশনের পাশে লেভেল কোচিংয়ের ট্রেনে কাটা পড়ে এক শিক্ষার্থী মারা যায়। সে সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় ১৫ দিনের মধ্যে রাস্তায় গেট এবং গেটম্যান দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো সেটির বাস্তবায়ন হয়নি। এইসব লেভেল কোচিংয়ে গেটম্যান এবং গেট না থাকায় দিনের পর দিন ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।
রেলওয়ে পুলিশের কুমিল্লা স্টেশন ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মোস্তফা কামাল জানান, দুর্ঘটনা রোধে লেভেল কোচিংগুলোতে নিরাপদ করতে আমরা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।
উল্লেখ্য, ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথটি দুই লাইনে উন্নীত হওয়ায় এ পথে রেলের গতি বেড়েছে দ্বিগুণ। এ ছাড়া আগের তুলনায় ট্রেন চলাচলেও বেড়েছে অনেক। এ রেলপথের ওপর দিয়ে যেসব রাস্তা গেছে সেসব রাস্তায় লেভেল কোচিংগুলোতে বিভিন্ন সময় যানবাহন আটকে গিয়ে ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এক একটি দুর্ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবার।